আলোচিতজাতীয়

৭ই মার্চের ভাষণ: প্রাপ্য শ্রদ্ধা, প্রাসঙ্গিক আক্ষেপ

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : ভোটে আস্থা যতই কমুক, ৭ই মার্চের ভাষণের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের ভোট হলে ফলাফল কী হবে তা সবারই জানা। ৫০ বছর পরও বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী ভাষণের গ্রহণযোগ্যতা এতটাই।

এই ভাষণও বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ছিল দীর্ঘকাল। কলঙ্কের সেই অতীত অনেকেরই জানা। তখন টেলিভিশনে যুদ্ধাপরাধীর ভাষণ দেখা যেতো, কিন্তু বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টার নাম, ছবি, ভাষণ সবই ছিল নিষিদ্ধ। বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টার, তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার বিচারও ‘নিষিদ্ধ’ ছিল তখন। হ্যাঁ, তখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ ক্ষমতাসীনেরা নিতো না, বরং গোলাম আযমের প্রতীকী বিচারের জন্য গণআদালত প্রতিষ্ঠার কারণে লেখিকা, শিক্ষাবিদ, শহিদ জননী, একাত্তরের ঘাতক, দালালবিরোধী আন্দোলনের নেত্রী জাহানারা ইমামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা হতো।

কিন্তু সেই সময় পেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশ। দেশে গোলাম আযমসহ অনেক যুদ্ধাপরাধীরই বিচার এবং সাজা হয়েছে। ক্ষমতা দখলের লালসায় চালানো ’৭৫-এর ১৫ই আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা পেয়েছে একুশে ফেব্রুয়ারি। ৭ই মার্চের ভাষণও নিষেধের বেড়াজাল ভেঙে বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধীদের মনোজগত ছাড়া বাকি সব জায়গায় উন্মুক্ত হয়েছে।

জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর বিশ্বপ্রামাণ্য ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেয়ে গেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণ। চলতি মার্চে তো ঐতিহাসিক সেই ভাষণ নিয়ে ফ্রান্সে বাংলাদেশের দূতাবাস ও ইউনেস্কোয় বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন যে গ্রন্থ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের ছয়টি দাপ্তরিক ভাষায় তার মোড়ক উন্মোচনও হয়ে গেল।

খন্দকার মোশতাকের সরকার (১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর), আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম সরকার (১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর থেকে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল), জিয়াউর রহমান সরকার (১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ১৯৮১ সালের ৩০ মে), আব্দুস সাত্তার সরকার (১৯৮১ সালের ৩০ মে থেকে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ), হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সরকার (১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর)এবং খালেদা জিয়া সরকার (১৯৯১ সালের ২০ মার্চ থেকে ১৯৯৬ সালের ৩০ মার্চ)-এর আমলে যা প্রকাশ্যে শোনা ছিল ভয়ঙ্কর অপরাধের মতো, তা এখন দেশের সীমানা পেরিয়ে বহু দূর পর্যন্ত স্বীকৃত, সম্মানিত!

এত ক্ষমতার দাপটে এতকাল নিষিদ্ধ রেখে কতটুকুই বা লাভ হয়েছে?

শেষ পর্যন্ত সারা দেশে প্রকাশ্যে, সগর্বে ৭ই মার্চের ভাষণ প্রচারের দিন তো এসেছেই। খ্রিস্টপূর্ব ৪৩১ থেকে ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় আড়াই হাজার বছরে সারা বিশ্বের ইতিহাসের সেরা ভাষণগুলো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয় ২০১৪ সালে। ‘উই শ্যাল ফাইট অন দ্য বিচেস- দ্য স্পিচেস দ্যাট ইন্সপায়ার্ড হিস্টোরি’ নামের সেই গ্রন্থেও ‘দ্য স্ট্রাগল দিস টাইম ইজ দ্য স্ট্রাগল ফর ইন্ডিপেন্ডেন্স’ শিরোনামে স্থান পেয়েছে বঙ্গবন্ধুর ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ভাষণ।

৭ই মার্চের ভাষণের এমন প্রচার, এমন স্বীকৃতি শতভাগ প্রাপ্য। এমন প্রাপ্তিতে আমরা আনন্দিত, গর্বিত। তবে ৫০ বছর আগে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (এখন সোহরাওয়ার্দি উদ্যান) ইতিহাসের এক ক্রান্তিলগ্নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ভাষণটি দিয়েছিলেন তা এক ধরনের আক্ষেপও জন্ম দেয় মনে। সেই আক্ষেপের সঙ্গে খন্দকার মোশতাক নামটা খুব জড়িত।

মোশতাক আওয়ামী লীগই করতেন৷ তার মুখেও ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রশংসা। প্রশংসায় তিনি বরং অন্য সবার চেয়ে বহু বহু ক্রোশ এগিয়েই ছিলেন। তার এত প্রশংসার উদ্দেশ্যটা নাকি বঙ্গবন্ধু বুঝতেন। বুঝতেন মোশতাক আসলে তোষামোদকারী বা ‘চাটা’ শ্রেণির লোক। এক সাক্ষাৎকারে তোফায়েল আহমেদ বলেছিলেন, ‘‘বঙ্গবন্ধু জানতেন মোশতাক কী পরিমাণ ধূর্ত। বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘মোশতাক তোমাকে ডান পকেটে করে বাজারে নিয়ে বিক্রি করে আবার বাঁ পকেটে নিয়ে এলে তুমি টেরও পাবে না৷’’ (ভোরের কাগজ, ১৪ আগস্ট, ১৯৯২)।

কিন্তু যা হয়, তোষামোদকারীদের ভীড়ে সত্যটা একসময় আড়ালে পড়েই যায়। পা-চাটা ধূর্ত মোশতাক ও তার সঙ্গীরা ভেতরে ভেতরে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পরিকল্পনা করলেও বঙ্গবন্ধু তা টের পাননি। কে না জানে, ৭ই মার্চের ভাষণের বলিষ্ঠ কণ্ঠ চিররুদ্ধ হয়েছিল মোশতাক গংয়ের কারণেই! মোশতাককে সময় থাকতে পুরোপুরি চিনতে না পারার আক্ষেপ বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে চিরকাল।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি কাশিমপুর কারাগারে মারা যান মুশতাক আহমেদ নামের এক লেখক। মুশতাক আহমেদ অনলাইনে লেখালেখি করতেন। সেই লেখার কারণে ২০২০ সালের ৬ মে র‌্যাব তাকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার করে। তারপর ছয়বার জামিনের আবেদন করা হলেও মুশতাক আহমেদ জামিন পাননি। কারাগারেই মৃত্যু হয় তার। তাকে কারাগারে নির্মম নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। কারা কর্তৃপক্ষের তদন্তে কোনো ‘গাফিলতি’ না পেলেও নির্যাতনের অভিযোগ এখনো উঠছে।

৭ই মার্চের ভাষণ যে খোন্দকার মোশতাক এবং তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমমনাদের নিষেধাজ্ঞার প্রাচীর ভাংতে পেরেছে- এটা বাংলাদেশের জন্য খুবই স্বস্তিদায়ক। তবে স্বাধীনতার ৫০ বছরে সেই স্বস্তিকে ম্লান করে দেয় একজন লেখকের এমন মৃত্যু।

 

সূত্র: ডয়চে ভেলে

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close
Close