আলোচিত

বেগমপাড়া: ক্ষমতা ছাড়া অর্থপাচার সম্ভব?

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : ক্যানাডায় বেগমপাড়া, মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম আর সিঙ্গাপুরের ব্যাংকে আট হাজার কোটি টাকার আলোচনা এখন বাংলাদেশে। বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচার করে বিদেশে সম্পদ গড়ে তোলার নতুন নতুন খবরে বিস্ময় সৃষ্টি হচ্ছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেন জানিয়েছেন ক্যানাডায় অর্থপাচারকারী যে ২৮ জনের তালিকা তার কাছে আছে তারমধ্যে ২৪ জনই সরকারি কর্মকর্তা। বাকিরা রাজনীতিবিদ। সরকারি কর্মকর্তারা এত টাকা কোথায় পেলেন?

আইনজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে টাকা পাচার বন্ধে শক্ত আইন থাকলেও পাচার বন্ধ হচ্ছে না। এটা ক্ষমতা না থাকলে সম্ভব নয়। আর অবৈধ অর্থ আয় বন্ধ না হওয়ায় তাদের হাতে পাচার করার মতো অর্থ জমছে। সরকার চাইলে এই পাচারকারীদের সহজেই চিহ্নিত করতে পারে। তারপর আইনি প্রক্রিয়ায় পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে এই টাকা ফেরত আনা সম্ভব৷ এরজন্য প্রয়োজন শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

সিঙ্গাপুরের ব্যাংকে আট হাজার কোটি টাকা

সিঙ্গাপুরের এক ব্যাংকে বাংলাদেশি একজনের পাচার করা আট হাজার কোটি টাকা রয়েছে বলে জানিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশন দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম। তিনি বলেন, ‘‘ওই টাকা ফেরত আনার সব ধরনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কিন্তু টাকা কার, তা আমরা এখনই প্রকাশ করছিনা।”

তবে দুদকসহ বিভিন্ন সূত্র দাবি করছে, ওই টাকা বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ড কার্যকর হওয়া একজন আসামির। তার বাড়ি চট্টগ্রাম এলাকায় এবং তিনি বিএনপি নেতা ছিলেন। তার পরিবারের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে জানা যায়, তারা এখন সবাই দেশের বাইরে রয়েছেন। দুদক সূত্র বলছে, পরিবারের সদস্যরাও ওই টাকা এখন দাবি করছে না।

খুরশীদ আলম বলেন, ‘‘এর বাইরেও আমরা অষ্ট্রেলিয়া, ক্যানাডা, মালয়েশিয়াসহ আরো অনেক দেশে বিভিন্ন ব্যক্তির পাচার করা অর্থের খোঁজ পাচ্ছি। ওই অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়াটি জটিল, তবে আনা সম্ভব।’’

বিশ্লেষকরা বলছেন, পাচারকারীদের চিহ্নিত করা কঠিন কাজ নয়। তারা বলেন, এপর্যন্ত মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম করেছেন চার হাজারের কিছু বেশি বাংলাদেশি। তাদের পাসপোর্ট ও ভিসার ক্যাটাগরি আলাদা, চাইলেই তাদের চিহ্নিত করা যায়। আবার মালয়েশিয়া সরকারের সেকেন্ড হোমের যে ওয়েবসাইট আছে, সেখানেও তাদের সংখ্যা ও তালিকা আছে। সরকার যথাযথ প্রক্রিয়ায় উদ্যোগ নিলেই তাদের ব্যাপারে তথ্য পেতে পারে।

এছাড়া ক্যানাডার বাংলাদেশি কমিউনিটি এখন বাংলাদেশ থেকে পাচার করা অর্থ দিয়ে দুর্নীতিবাজদের গড়ে তোলা বেগমপাড়ার ব্যাপারে আন্দোলন করছে। তাদের কাছ থেকেও প্রাথমিক তথ্য নেয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী যে ২৮ জনের কথা বলেছেন তাদের ব্যাপারেও আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা প্রয়োজন। বিভিন্ন দেশে বাস করা বাংলাদেশিদেরও পাচারকারীদের চিহ্নিত করতে কাজে লাগানো যেতে পারে। ব্যবহার করা যেতে পারে ‘মিউচ্যুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসটেন্স আইন ২০১২’।

দুদক সূত্র জানিয়েছে, এপর্যন্ত বাংলাদেশের ৬০ ব্যক্তির অর্থপাচারের তথ্য চেয়ে ১৮টি দেশে চিঠি দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ক্যানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভারতের নাম রয়েছে। ইতিমধ্যে ৩০ জনের ব্যাপারে চিঠির জবাব পাওয়া গেছে।

হাইকোর্ট এরইমধ্যে অর্থপাচারকারীদের তালিকা ও তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, তা জানতে চেয়েছে। খুরশিদ আলম বলেন, ‘‘শুধু দুদক নয়, সরকারের আরো কয়েকটি সংস্থা এনিয়ে কাজ করছে।”

অর্থপাচার ঠেকাতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে দুদক, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব আছে। আর পাচার হওয়া অর্থের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করার জন্য বিশ্বের ১৬২টি দেশের সাথে বাংলাদেশের মিউচুয়্যাল লিগ্যাল অ্যাসিসটেন্স চুক্তি আছে। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে তৈরি আন্তর্জাতিক সংগঠন এগমন্ট গ্রুপের সদস্য বাংলাদেশ। এটি বিভিন্ন দেশের ১৬৬টি ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সংগঠন৷ ইন্টারপোলের সহায়তাও নেয়া যায়।

‘রাষ্ট্র চাইলে সম্ভব’

বাংলাদেশে মানিলন্ডারিং বিরোধী আইন অনেক শক্ত৷ তারপরেও কাজ হচ্ছে না কেন? সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘‘আসল কথা হলো সদিচ্ছা। ক্ষমতাধর না হলে অর্থপাচার করা যায় না। আর ক্ষমতাসীনরাই ক্ষমতাধর। তাই সদিচ্ছার অভাবে অর্থপাচারের বিরুদ্ধে আইন থাকলেও তাই পাচার বন্ধ হচ্ছেনা। রাষ্ট্র যদি চায় তাহলে সম্ভব।”

তিনি বলেন, ‘‘তবে অর্থ পাচার হয়ে গেলে তা ফেরত আনা অনেক জটিল। প্রথমে যিনি পাচার করেছেন তার বিরুদ্ধে আদালতে চূড়ান্তভাবে অভিযোগ প্রমাণ করতে হবে। তারপরে অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ নিতে হবে। এটা একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া। তার চেয়ে সহজ হলো পাচারকারীদের দেশে ফেরত আনা। তাদের ফেরত আনলে তাদের মাধ্যমেই পাচারের অর্থ ফেরত আনা সহজ।”

সরকারি কর্মকর্তারা অর্থপাচার করায় নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। বিআইডিএস-এর অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, ‘‘সরকারি কর্মকর্তারাই বিভিন্ন পর্যায়ে পাচার ঠেকানো এবং পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত। এখন তারাই যদি পাচার করেন তাহলে তো সংকট অনেক গভীরে৷ সর্ষের মধ্যেই ভূত।”

তার মতে, দুর্নীতি আগে বন্ধ করতে হবে। দুর্নীতির টাকাই পাচার হয় বেশি। সরকারি কর্মকর্তারা এত টাকা কোথায় পান?

 

 

সূত্র: ডয়চে ভেলে

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close
Close