মুক্তমত

বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ আদালত ফেসবুক

সংবাদভাষ্য : রম্য ওয়েবসাইট ই-আরকি একটু কার্টুন করেছে। এক ভুক্তভোগী পুলিশের কাছে গেছে। পুলিশ টেবিলের ওপর পা তুলে আরাম করে বসেছিলেন। ভুক্তভোগী অভিযোগ করতে চাইলে খুব বিরক্তি নিয়ে পুলিশ বললেন, ‘‘বললাম তো, ঘটনা ভাইরাল হলে তখন আইসেন।’’

রম্য ওয়েবসাইট ই-আরকি একটু কার্টুন করেছে। একজন ভুক্তভোগী পুলিশের কাছে গেছে। পুলিশ কর্মকর্তা টেবিলের ওপর পা তুলে আরাম করে বসেছিলেন। ভুক্তভোগী অভিযোগ করতে চাইলে খুব বিরক্তি নিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা বললেন, ‘‘বললাম তো, ঘটনা ভাইরাল হলে তখন আইসেন।’’ মূল প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে সাংবাদিক ও লেখক গোলাম কিবরিয়ার একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস শেয়ার করছি, ‌‘‘এখন আর তারা নিজেদের ‌‘বীরত্ব’ ভিডিও করবে না। আর এটা তো দিবালোকের মতো পরিষ্কার, ভিডিও ভাইরাল না হলে কোনো রিস্ক নাই!’’

মানেন আর না-ই মানেন, বাংলাদেশে এটাই এখন বাস্তবতা।

এখন আপনাকে ধর্ষিত বা নির্যাতিত হওয়ার সময় ভিডিও করা বা সিসিটিভি ফুটেজ নিশ্চিত করতে হবে, নইলে বিচার পাওয়াটা অনিশ্চিত হয়ে যাবে। শুধু ভিডিও থাকলেই হবে না, সেটা ফেসবুকে ভাইরাল করতে হবে।

একবার ভাবুন, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের যে ভিডিও নিয়ে সারাদেশ তোলপাড়, সেটি যদি নির্যাতকরা ফেসবুকে আপলোড না করতো, তাহলেই কিন্তু কেউ এই নির্মমতার কথা জানতেই পারতো না। তারা তো সেই নারীকে শায়েস্তা করার জন্য, সামাজিকভাবে হেয় করার জন্য ৩২ দিন ভিডিওটি ফেসবুকে আপলোড করেছিল। তখনও তারা বুঝতেই পারেনি, বিষয়টি এভাবে তাদের জন্য ‘হিতে বিপরীত’ হয়ে যাবে। আচ্ছা, এবার ভাবুন, ঘটনাটি ২০ বছর আগে ঘটেছে; যখন মানুষের হাতে হাতে স্মার্টফোন ছিল না, যখন ফেসবুক আবিস্কার হয়নি; তাহলে কী হতে পারতো? এই ঘটনা নিয়ে শাহবাগে আন্দোলন তো দূরের কথা, বেগমগঞ্জ থানা পর্যন্ত যেতো কিনা সন্দেহ৷ বরং সেই নারীকে ‘চরিত্রহীন’ আখ্যা দিয়ে তার মাথার চুল কেটে, ঘোল ঢেলে, দোররা মেরে একঘরে করে রাখার সুযোগই বেশি ছিল।

মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতিত হওয়ার পরও সেই নারী কিন্তু ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা ভেবে থানায় যাননি। স্থানীয় ইউপি সদস্যের কাছে গেলেও, তিনি সেই নারীকে ঘটনাটি চেপে যেতে বলেছিলেন। পুরো ঘটনাটি চেপে যাওয়ার সকল আয়োজন সম্পন্নই ছিল। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই নির্যাতকদের জন্য কাল হলো।

ফেসবুক না থাকলে কেউ জানতেই পারতো না বেগমগঞ্জে কী হয়েছে? আমি আপনাদের নিশ্চিত করে বলতে পারি, বেগমগঞ্জে যা হয়েছে, প্রতিদিন বাংলাদেশে এর চেয়ে ভয়ঙ্কর অনেক ঘটনা ঘটে। কিন্তু হয় তার ভিডিও থাকে না, অথবা থাকলেও তা কোনো কারণে ভাইরাল হয় না। ব্যস নো ভাইরাল, নো জাস্টিস। আচ্ছা কিছুক্ষণের জন্য আবেগ দূরে রাখুন, মাথা থেকে বেগমগঞ্জের ভিডিওটিও সরিয়ে রাখুন। ভাবুন বেগমগঞ্জে কয়েকজন অমানুষ একজন নারীকে বিবস্ত্র করে সেটা ভিডিও করছিল ভবিষ্যৎ ব্ল্যাকমেইলের জন্য। সেই ভিডিওর ভয়াবহতা এবং বাঁচার জন্য সেই নারীর আকুতি আমাদের সবার ভাবনার জগতে তুমুল আলোড়ন তুলেছে। এমন ধরনের ঘটনা দেখে আমরা অভ্যস্ত নই। আমাদের অনভ্যস্ত মনস্তত্ব বিষয়টি নিতে পারেনি।

পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ, বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদন ধরলে বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে কমপক্ষে ৫টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, যার প্রতিটিই বেগমগঞ্জের ঘটনার চেয়ে ভয়াবহ। আরেকবার ভাবুন, বেগমগঞ্জে কিন্তু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু প্রতিটি ধর্ষণেই বিবস্ত্র করার ঘটনা ঘটে। বিবস্ত্র করা হলো, ধর্ষণের একদম প্রাথমিক পদক্ষেপ। বেগমগঞ্জে এইটুকু দেখেই আমরা এলোমেলো হয়ে গেছি। কিন্তু ধর্ষণের ঘটনায় বিবস্ত্র করার পর একজন অনিচ্ছুক নারীর সাথে জোর করে যা হয়, তা কিন্তু ভয়ঙ্কর শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার।

প্রতিটা ধর্ষিত নারী নিশ্চয়ই বেগমগঞ্জের সেই বোনটির চেয়েও আরো জোরে, আরো কষ্টে চিৎকার করে। কিন্তু হায় ভিডিও নাই বলে, ভাইরাল হয় না বলে সেই চিৎকার আমাদের কানে পৌঁছায় না। তাই আমরা প্রতিবাদও করি না।

মানুষের ইন্দ্রিয় পাঁচটি। গণযোগাযোগের থিওরি বলে আপনি একজন মানুষের যত বেশি ইন্দ্রিয় স্পর্শ করতে পারবেন, তত তার নিকটে পৌঁছতে পারবেন। চাইলে কিন্তু একটি পত্রিকা শুধু লেখা দিয়েও ছাপা সম্ভব। কিন্তু লেখা যত ভালোই হোক, সেই পত্রিকা কিন্তু বেশি লোক কিনবে না। পাঠকের নজর কাড়তে পত্রিকার মেকআপ আকর্ষণীয় করতে চাই ছবি। চমৎকার একটি ছবি অনেক বেশি পাঠককে স্পর্শ করবে। বলাই হয়, একটি ছবি হাজার শব্দের চেয়েও শক্তিশালী। আর টেলিভিশন মানেই তো ছবি। যত ভালো ছবি, তত বেশি দর্শক। গণমাধ্যমের এই তত্ত্বটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ক্ষেত্রেও বাস্তবতা। আমার এক বন্ধু ফেসবুকে তার সব স্ট্যাটাসের সাথেই প্রাসঙ্গিক-অপ্রাসঙ্গিক ছবি জুড়ে দেয়। একদিন জানতে চাইলাম কেন? তিনি বললেন, ছবি দিলে মানুষের চোখে পরে তাড়াতাড়ি, লাইকও পরে বেশি। তিনি হয়তো না জেনেই গণযোগাযোগের সেই থিওরি অনুসরণ করছেন। মানুষকে স্পর্শ করার সেই ঘটনাই ঘটছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ভিডিও থাকলেই ভাইরাল। আর ভাইরাল হলেই জনমত।

এই জনমতেই লুকিয়ে আছে ভাইরালের সাফল্য। ফেসবুক হলো দ্রুত জনমত যাচাই ও গঠনের সবচয়ে সহজ প্ল্যাটফরম। আর জনমত গড়ে উঠলে আসামী গ্রেপ্তার হয়, দ্রুত বিচার হয়। বর্তমান সরকারের একটা ভালো দিক হলো, তারা জনমতকে বিবেচনায় নেয়।

বিভিন্ন ইস্যুতে স্বতস্ফূর্তভাবে গড়ে ওঠা অনেক আন্দোলন প্রশমিত হয়ে যায় সরকারের দ্রুত ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে। সিলেটের এমসি কলেজের হোস্টেলে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা ধর্ষণ করলেও পুলিশ দ্রুত তাদের গ্রেপ্তার করায় আন্দোলন দানা বাঁধতে পারেনি। বেগমগঞ্জের ঘটনার পর দেশজুড়ে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে স্বতস্ফূর্ত আন্দোলন গড়ে উঠেছে। তবে ইতিমধ্যেই বেগমগঞ্জের ঘটনায় জড়িত অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছে। আর ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির দাবিটি বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন আইনমন্ত্রী। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তির জন্য মানুষকে আন্দোলন করতে হবে কেন? ধর্ষণ বন্ধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে কাজ করছে না কেন?

বাংলাদেশে এখন বিরোধী দল নেই বললেই চলে। কাগজে-কলমে সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি আসলে সরকারেরই অংশ৷ প্রকৃত বিরোধী দল বিএনপি অথর্ব, নিষ্ক্রিয়। তারা কোথাও নেই৷ দেশে এখন গণতান্ত্রিক স্পেস সঙ্কুচিত।

মতপ্রকাশের প্রাতিষ্ঠানিক জায়গাগুলো ধ্বংসপ্রায়। এ অবস্থায় মানুষের মত প্রকাশের, ক্ষোভ প্রকাশের একমাত্র খোলা জানালা ফেসবুক। ২০১৩ সালে শাহবাগের যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ সাজার দাবিতে যে ক্ষোভের আগুন জ্বলেছিল, তার স্পার্কটাও ছিল ফেসবুকেই। দুই বছর আগে নিরাপদ সড়কের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনও ফেসবুক থেকেই শুরু। এবার ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনও ফেসবুক থেকেই শুরু। শুধু বড় আন্দোলন নয়, ছোট-বড় অনেক ঘটনাকেই বিচারের কাঠগড়ায় নিয়ে যাওয়ার কৃতিত্ব ফেসবুকের। একটু মনে করে দেখুন, সিলেটে রাজন নামের এক কিশোরকে চুরির অপরাধে বেঁধে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছিল। সাধারণভাবে এই ঘটনা জাতীয় দৈনিকের মফস্বল পাতার এক কলামের নিউজ।

কিন্তু পেটানোর ভিডিও থাকায় রাজনের মৃত্যু সারাদেশের মানুষকে কাঁদিয়েছিল। মূল আসামী সৌদি আরব পালিয়ে গিয়েও রেহাই পায়নি। প্রবাসী বাংলাদেশীরা তাকে ধরে দেশে ফেরত পাঠিয়েছিল। এরচেয়ে কত ভয়ঙ্কর ও দুর্ধর্ষ আসামি দেশের ভেতরেই দাপটে ঘুরে বেরায়, পুলিশ ফিরেও তাকায় না। যেমন বেগমগঞ্জের গৃহবধূকে বিবস্ত্র করার ঘটনায় জড়িত দেলোয়ারের বিরুদ্ধে খুনের মামলা ছিল।

খুনের মামলার আসামি হয়েও এলাকায় ঘুরে বেরিয়েছে রাজার হালে, নারীদের বস্ত্রহরণ করেছে। আর এখন সেই মামলার আসামী না হয়েও সারাদেশের মানুষের ঘৃণার তালিকায় এক নাম্বারে উঠে এসেছে দেলোয়ার। এখানেই সা্মাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের শক্তি। সিলেটের রাজন না হয় মারা গিয়েছিল, সিলেটের এমসি কলেজের খাদিজা তো গুরুতরভাবে আহত হয়েছিলেন। ছাত্রলীগ নেতা বদরুল তাকে কুপিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করেছিল৷ আবার অনুরোধ করছি, আবেগ সরিয়ে একবার ভাবুন, ‘প্রেমিকের কোপে কলেজছাত্রী গুরুতর আহত’ এই শিরোনাম আপনাকে কতটা স্পর্শ করতো? কিন্তু যখন আপনি সেই কোপানোর ভিডিও দেখেছেন, তখন আপনি আতঙ্কে-ঘৃণায় কেঁপে উঠেছেন। গত দুই দশকে দেশে কয়েক হাজার মানুষকে ক্রসফায়ারের নামে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়েছে। অথচ বছর দশেক আগে ঝালকাঠিতে লিমন নামে এক কিশোরের পায়ে গুলি করে বিপাকে পড়েছিল র‌্যাব। টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুলের কন্যার এক প্রশ্ন, ‘‘আব্বু, তুমি কান্না করতেছো যে?’’ চোখের জলে ভাসিয়েছে গোটা দেশকে৷ পুরান ঢাকার বিশ্বজিৎ, ফেনীর নুসরাত, বুয়েটের আবরার- ফেসবুকের কারণে বিচার পেয়েছে এমন ঘটনার তালিকা অনেক লম্বা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষের এই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, প্রতিবাদ, গড়ে ওঠা জনমত দারুণ ইতিবাচক। তবে আইনের শাসন আছে, সুশাসন আছে এমন রাষ্ট্রে এমনটা কাম্য নয়। অবশ্যই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদ হবে, জনমত গড়বে; কিন্তু আইন তো চলবে তার নিজস্ব গতিতে। ফেসবুকে ভাইরাল হলে সুপারসনিক গতি, নইলে কচ্ছপের; এটা তো কোনো কাজের কথা নয়। বাংলাদেশে প্রতিদিন ধর্ষণ হয়, খুন হয়, সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যায়- অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা কয়টার প্রতিবাদ করবে। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গড়ে ওঠা ধারণা দিয়ে তো বিচারক বিচার করবেন না। আইডিয়ালি বিচারকদের চোখ বাঁধা থাকার কথা। তারা শুধু সাক্ষ্য-প্রমাণ দেখবেন। কিন্তু বিচারকরাও তো এই সমাজেরই মানুষ। তাদেরও ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আছে। তারাও পত্রিকা পড়েন। তাই রাস্তায় গড়ে ওঠা ধারণার প্রভাব পরে বিচারেও৷ সরকারের দায়িত্ব আইনের শাসন নিশ্চিত করা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটা-দুটো ঘটনা আলোড়ন তুলবে, ভাইরাল হবে, আন্দোলন হবে। আর সরকার সব ঘটনার ন্যায্য ন্যায়বিচার করবে।

সরকার নারীদের জন্য, সব মানুষের জন্য নিরাপদ দেশ গড়বে; ধর্ষক, খুনী, মাদক ব্যবসায়ী, চোরাকারবারীরা থাকবে আইনের আওতায়। সরকার যখন তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তখনই মানুষ সোচ্চার হয় প্রতিবাদে, রাস্তায় নামে।

যতদিন সরকার সব ঘটনার ন্যায়বিচার নিশ্চিত না করবে, অপরাধীদের না ধরবে; যতদিন বিচারের বাণী নীরবে কাঁদবে, যতদিন অপরাধীরা সরকারি দলের প্রশ্রয় পাবে; আপাতত ততদিন ফেসবুকই ভরসা। বাংলাদেশে ট্রাক, বাস, সিএনজি বা রিকশার মতো গণপরিবহণের পেছনে নানা চিত্তাকর্ষক বাণী লেখা থাকে। সবচেয়ে বেশি লেখা থাকে, মায়ের দোয়া বা আশীর্বাদ কামনা। তবে আমার কাছে ইন্টারেস্টিং লেগেছে, ‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আদালত মানুষের বিবেক।’ কয়েকদিন পর যদি লেখা হয়, ‌‘বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ আদালত ফেসবুক’, আমি একদমই অবাক হবো না।

 

 

প্রভাষ আমিন, সাংবাদিক ও লেখক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close
Close