আন্তর্জাতিকআলোচিত

পেঁয়াজ রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা: ভারতের পেঁয়াজ-চাষিদের মধ্যে চলছে তীব্র ক্ষোভ

গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ভারতে কেন্দ্রীয় সরকারের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ১৩ই সেপ্টেম্বর অনির্দিষ্ট কালের জন্য পেঁয়াজ রপ্তানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

সেদিন সন্ধ্যায় এই খবরটি প্রকাশিত হওয়ার পর পেঁয়াজ-চাষিদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র ক্ষোভ।

উমরানে, লাসালগাঁও, সাতানা এবং নাগপুর- পেঁয়াজের জন্য বিখ্যাত এসব বাজারে নিলামে পণ্য বিক্রি বন্ধ করে দিয়ে তারা সরকারি এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন।

উমরানের ক্ষুব্ধ কৃষকরা মুম্বাই-আগ্রা জাতীয় মহাসড়কে অবরোধ সৃষ্টি করে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়।

বিক্ষোভকারীরা বলেন, “কেন্দ্রীয় সরকার চাষিদের ধ্বংস করে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ১০ গ্রাম সোনার দাম যখন ৫০ হাজার রুপিতে পৌঁছালো, এক কেজি মাংসের দাম হলো ৭০০ রুপি, সরকার তো এসব খাতে তখন কোন ব্যবস্থা নেয়নি। চাষিরা যখন পাঁচ/ছয় রুপি কেজিতে পেঁয়াজ বিক্রি করছিল তখন কি তারা ঘুমিয়েছিল?”

মহারাষ্ট্রে পেঁয়াজ-চাষি সমিতির প্রেসিডেন্ট ভারাত দীঘল পেঁয়াজ রপ্তানি নিষিদ্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্তের নিন্দা করেছেন।

তিনি বলেছেন, “কেন্দ্রীয় সরকার যদি নিষেধাজ্ঞা তুলে না নেয়, চাষিরা বাজারে পেঁয়াজ আনবে না এবং এক গাড়ি পেঁয়াজও মহারাষ্ট্রের বাইরে যাবে না। এর ফলে পেঁয়াজের অভাব দেখা দিলে এবং দাম বেড়ে গেলে এর জন্য সরকার দায়ী থাকবে।”

তিনি বলেন, চাষিরা এবার আর মাথা নত করবে না।”

পেঁয়াজ-চাষিরা এবছরের মার্চ মাস থেকে প্রতি কেজি পেঁয়াজ চার থেকে ছয় রুপি দরে বিক্রি করে আসছে। কিন্তু এক কেজি পেঁয়াজ উৎপাদন করতে তাদের খরচ হয় ২০ রুপির মতো।

গত বছর ভাল আবহাওয়ার কারণে ভারতে পেঁয়াজের উৎপাদন ৪০ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল। ফলে অনেক কৃষক তাদের উৎপাদিত পণ্য তখনই বিক্রি না করে মজুদ করে রেখে দিয়েছিল আরো বেশি দামে বিক্রি করার আশায়।

কিন্তু পরে করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে লকডাউন জারি করা হলে এই পেঁয়াজই কৃষকদের চোখে অশ্রু ঝরিয়ে ছাড়ে।

এবছর অতিবৃষ্টি এবং বাতাসে আর্দ্রতা বেশি হওয়ার কারণে মজুদ করে রাখা পেঁয়াজের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পচে নষ্ট হয়ে যায়। গত বছরের তুলনায় এবছর রপ্তানির পরিমাণও ছিল বেশি। কিন্তু উৎপাদন যথেষ্ট ছিল না।

জুলাই ও অগাস্ট মাসে প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে খারিফ এলাকায় পেঁয়াজের ফলন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় গুজরাট, মধ্য প্রদেশ, অন্ধ্র প্রদেশ এবং কর্নাটকাতে লাল পেঁয়াজের ফসলও।

মহারাষ্ট্রেও লাল পেঁয়াজের বীজের সঙ্কট দেখা দেয়। ফলে লাল পেঁয়াজ সেপ্টেম্বর মাসে জমি থেকে তোলার কথা থাকলেও সেটা পেতে পেতে দেড় মাস দেরি হয়।

একারণে বাজারে মজুদ করে রাখা লাল পেঁয়াজের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। গত চার দিন ধরে কৃষকরা প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম পেয়েছে ৩০ রুপি করে।

কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার রপ্তানি নিষিদ্ধ করার মাত্র দুদিন বাদে ১৫ই সেপ্টেম্বরে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ১০ রুপিতে নেমে আসে।

নাশিকের জয়গাও এলাকায় পাঁচ একর জমিতে পেঁয়াজের চাষ করেছেন ভীমা দীঘল। কিছু পেঁয়াজ তিনি বাজারে বিক্রি করেছেন এবং বাকিটা তিনি মজুদ করে রেখেছেন।

তিনি আশা করেছিলেন অগাস্ট মাসের পর থেকে পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধি পাবে এবং তার ফলে তার উৎপাদনের খরচ উঠে আসবে।

শুরুতে তিনি তার উৎপাদিত কিছু পেঁয়াজ বাজারে বিক্রি করেছিলেন। প্রতি ১০০ কেজি পেঁয়াজে তিনি পেয়েছিলেন ৪০০ থেকে ৭০০ রুপি। অর্থাৎ প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম পেয়েছেন মাত্র চার থেকে সাত রুপি।

পাঁচ একর জমিতে পেঁয়াজ চাষ করতে তার খরচ হয়েছে প্রায় আড়াই লাখ রুপি এবং আশা করেছিলেন যে পৌনে দুই লাখ রুপি তিনি পেয়ে যাবেন মজুদ করে রাখা পেঁয়াজ বিক্রি করে। কিন্তু তিনি দেখলেন যে খারাপ আবহাওয়ার কারণে অর্ধেক পেঁয়াজই পচে গেছে।

প্রথমে করোনা, তারপর প্রবল বৃষ্টি
স্ত্রী ও দুই সন্তানকে সাথে নিয়ে তিনি নিজে জমি থেকে পেঁয়াজ তোলেন। অর্থের অভাবে এবার তারা কোন শ্রমিক ভাড়া করেন নি।

ভীমা দীঘল জানিয়েছেন যে তিনি পাঁচ লাখ কেজি পেঁয়াজ মজুদ করেছিলেন কিন্তু জুলাই মাসের শেষ নাগাদ এসব পেঁয়াজ পচতে শুরু করে।

একারণে কৃষকরা ভাল দাম পাচ্ছিলেন না।

প্রথমে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয় এবং তার পর অগাস্ট মাসে শুরু হয় প্রবল বৃষ্টিপাত। এর ফলে পেঁয়াজ পচে যেতে শুরু করে যাতে কৃষকরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

“এখন আবার দাম বেড়ে গেছে। আমরা ভেবেছিলাম পেঁয়াজ উৎপাদন করতে গিয়ে যে খরচ হয়েছে সেটা তুলে নেওয়ার পাশাপাশি আগামী মওসুমের জন্যও পুঁজি সংগ্রহ করতে পারবো।”

“কিন্তু রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর পেঁয়াজের দাম আবার কমে গেছে। আমার মনে হয় না যে আমি আমার খরচও তুলতে পারবো। এছাড়া আগামী মওসুমে কী হবে সেটাও আমরা জানি না। সব সময় কৃষকরাই কেন ক্ষতির বোঝা বহন করবে?”

যেসব ব্যবসায়ী পেঁয়াজ ক্রয় ও প্রক্রিয়াজাত করার পর রপ্তানি করে তারা সরকারের সবশেষ সিদ্ধান্তের ফলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।

রপ্তানিকারক ভিকাস সিং বলেছেন তাদের সমিতির হিসেবে পেঁয়াজ-ভর্তি প্রায় ৬০০ কন্টেইনার বন্দরে আটকা পড়ে আছে।

তিনি বলেন, “আগাম কোন ধরনের ইঙ্গিত না দিয়ে সরকার পেঁয়াজ রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। যেসব শুল্ক কর্মকর্তারা আমাদের কন্টেইনারগুলো জাহাজে তুলেছিলেন, ১৪ তারিখে তারাই আবার সেগুলো জাহাজ থেকে নামিয়ে ফেলেছেন এবং এগুলোর অর্ধেক এখনও বন্দরের বাইরে পড়ে আছে।”

“আমার ২৭টি কন্টেইনার মুম্বাই বন্দরে এবং আরো পাঁচটি টুটিকরিন বন্দরে আটকা পড়ে আছে। ১৪ই সেপ্টেম্বরে তারা এসব কন্টেইনার পাঠায় নি। সকালে কাস্টম এজেন্ট জানান যে এসব পাঠানোর ব্যাপারে ক্লিয়ারেন্স পেতে সমস্যা হচ্ছে,” বলেন ভিকাস সিং।

তিনি আরো বলেন, “পেঁয়াজ রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে আমরা জানতে পারি ১৪ই সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায়। কিন্তু তার আগে ১২ এবং ১৩ই সেপ্টেম্বর কাস্টম ডিপার্টমেন্ট মালবাহী জাহাজ থেকে কন্টেইনারগুলো নামিয়ে রাখে। অন্যান্য দেশের পেঁয়াজ আমদানীকারকরা এধরনের বিভ্রান্তিতে খুবই নাখোশ হয়েছেন। ভারতকে তারা বলেছেন অনির্ভরযোগ্য রপ্তানিকারক দেশ। এসব কারণে আমরা এবং আমাদের দেশ মুখ রক্ষা করতে পারবে না।”

“আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী চীন, পাকিস্তান এবং হল্যান্ডকে আমরা সুযোগ করে দিচ্ছি। একদিকে সরকার আত্মনির্ভর ভারত হয়ে ওঠার জন্য পরিবহনে ভর্তুকি দিচ্ছে, কিন্তু অন্যদিকে তারা রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে। ফলে পণ্য বহনকারী সব পরিবহনই তো বন্ধ হয়ে যাবে।”

রপ্তানিকারক ভিকাস সিং বলেন, সরকারের এই সিদ্ধান্তে পেঁয়াজ-চাষি, শ্রমিক, কাস্টম এজেন্ট, যারা প্যাকিং সামগ্রী তৈরি করে এবং রপ্তানিকারক- সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

“আমরা ঠিক জানি না এই অবস্থার মধ্যে আমরা কতো মাস থাকবো। কন্টেইনারগুলো যদি বন্দরে ঠিক সময়ে যায় তাহলে ঠিক আছে, কিন্তু একটি কন্টেইনার যদি যেতে না পারে তাহলে আট থেকে দশ লাখ রুপি ক্ষতি হয়ে যাবে। আমরা যাদেরকে চাকরি দিয়েছি তাদের কথাও তো ভাবতে হবে। এছাড়াও আন্তর্জাতিক বাজারে কেউ আমাদের পণ্য কিনবে কিনা সেটা নিয়েও আমরা চিন্তিত।”

রপ্তানি বন্ধের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্তে মধ্য-স্বত্বভোগীরাও বিস্মিত হয়েছেন। এর আগেও সরকার এধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। কিন্তু তখন এবিষয়ে আগাম ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। ফলে তখন পেঁয়াজের রপ্তানি মূল্যও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এবছর হঠাৎ করেই এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

মধ্যসত্বভোগীরা তাদের নাম পরিচয় প্রকাশ করে এবিষয়ে খোলামেলা কথা বলতে চায়নি। তারা বলেছে যে কোন ধরনের মন্তব্য করে তারা সরকারের নজরদারিতে পড়তে চান না।

পেঁয়াজের মূল্য নিয়ে ভোক্তাদের দিক থেকে যখন কোন অভিযোগ ছিল না তখন সরকার কেন ও কার স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেবিষয়ে প্রশ্ন করছেন অনেকেই। এজন্য দুটো কারণের কথা বলা হচ্ছে।

প্রথমত সামনে বিহারের নির্বাচন। তার আগে পেঁয়াজের মূল্য যাতে বেড়ে না যায় কেন্দ্রীয় সরকার সেবিষয়টি মাথায় রেখেছে। দাম বেড়ে গেলে ভোটাররা অসন্তুষ্ট হবেন এটা একটা কারণ হতে পারে।

আরেকটা কারণ হতে পারে যে বৃষ্টির কারণে পাকিস্তান ও চীনের মতো আন্তর্জাতিক বাজারেও পেঁয়াজের ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব দেশেও পেঁয়াজের সঙ্কট দেখা দিয়েছে। হল্যান্ডে ফসল তুলতে ৩০ থেকে ৪০ দিন বিলম্ব ঘটবে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পেঁয়াজের চাহিদা রয়ে গেছে।

গুজরাট, মধ্য প্রদেশে এবং অন্ধ্র প্রদেশেও বৃষ্টির কারণে পেঁয়াজের ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লাল পেঁয়াজ ইতোমধ্যে না হলেও, আগামী অক্টোবর মাসের মধ্যেই বাজারে চলে আসার কথা। তবে তার পরিমাণ আগের তুলনায় কম হবে।

নাম প্রকাশ করতে চাননি এরকম একজন ব্যবসায়ী বলেছেন, যেহেতু চাহিদা বাড়ছে সেকারণে পেঁয়াজের দামও আরো অনেক বৃদ্ধি পাবে। আর এবিষয়টি বিবেচনা করেই সরকার রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

সরকারি এই সিদ্ধান্তে খুশি হতে পারেন নি অর্থনীতিবিদরাও। কৃষি ও অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মিলিন্দ মুরুগকার বলেছেন, “সরকার কেন এটা করলো তা বোধগম্য নয়। রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আপনি এক অর্থে অর্থের সরবরাহ বন্ধ করে দিচ্ছেন। যেহেতু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২৪ শতাংশ কমে গেছে সেকারণে অর্থনীতি চাঙ্গা করতে বাজারে আমাদের ক্রয় বিক্রয় বাড়াতে হবে।”

“পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ায় অর্থের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে। এর ফলে পেঁয়াজ-চাষি থেকে শুরু করে এর ওপর নির্ভরশীল বিপুল পরিমাণ জনশক্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বর্তমানে দরকার ক্রয় ক্ষমতা বাড়ানো যা বাজারে আরো অর্থ নিয়ে আসবে। কৃষি পণ্যের ওপর কোন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা ঠিক নয় কারণ এর ওপর বহু মানুষ নির্ভরশীল,” বলেন অর্থনীতিবিদ মুরুগকার।

“একদিকে করোনাভাইরাসের মহামারির সময় তিনটি বিল পাস করে আপনি বাহবা নিচ্ছেন। আপনি বলছেন, এর ফলে বাজার ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক বাজার ও কৃষিপণ্যের মধ্যে সমন্বয় ঘটবে। এছাড়াও কৃষকদের ওপর কোন নিয়ন্ত্রণ না থাকায় তারা ন্যায্য মূল্য পাবে। কিন্তু অন্যদিকে সরকার এই অযৌক্তিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।”

তিনি বলেন, “মহামারির সময়ে লোকজন তাদের গ্রামে ফিরে গেছে। তারা এখন কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এরকম পরিস্থিতিতে কৃষি খাত থেকে আয় বাড়াতে হবে। কৃষকরা যাতে তাদের উৎপাদিত পণ্যের যথাযথ মূল্য পায় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু সেরকম কিছু হচ্ছে না। এধরনের সিদ্ধান্ত অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর,” বলেন অর্থনীতিবিদ মুরুগকার।

 

সূত্র: বিবিসি

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close
Close