অর্থনীতিআলোচিত

পাচার হওয়া অর্থের খুব কমই ফেরত আসে

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : পিকে হালদার দেশে ফিরে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দিতে চান। এই ঘটনায় পাচার হওয়া অর্থের বিষয়টি আবারো আলোচনায় এসেছে৷ বাস্তবে এমন বিষয় নিয়ে কতটা উদ্যোগী দুদক?

অর্থ পাচারের মামলা দুদক যেমন করে, তেমনি সিআইডি এবং পুলিশের অন্যান্য বিভাগও করে। আর তাদের সহায়তা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। ফলে গত এক বছরে অর্থ পাচারের কত মামলা হয়েছে তার তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে কোথাও নেই। তবে কথা বলে জানা গেছে, দুদকই বেশি করেছে এবং এর সংখ্যা ৫০টির মতো।

বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের খুব বেশি নজিরও নেই। ২০১২ এবং ২০১৩ সালে তিন দফায় সিঙ্গাপুরের একটি ব্যাংকে থাকা খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর ২১ কোটি টাকারও বেশি অর্থ ফেরত আনতে পেরেছিল দুদক। পাশাপাশি যুক্তরাজ্যকে ৩ লাখ মার্কিন ডলার উদ্ধার করে দিয়েছে বাংলাদেশ।

এর বাইরে ওয়ান ইলেভেনের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ট্রুথ কমিশন গঠন করে ৩৪ কোটি টাকা উদ্ধার করা হয়েছিল। ২০০৭ সালের এপ্রিল থেকে ২০০৮ সালের নভেম্বর পর্যন্ত জরুরি অবস্থার সময় দুর্নীতিবিরোধী টাস্কফোর্স বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এক হাজার ২৩২ কোটি টাকা উদ্ধার করে সরকারি কোষাগারে জমা দেয়। তবে এরমধ্যে আবার ৬১৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা দেশের সর্বোচ্চ আদালত ফেরত দেয়ার নির্দেশ দেয়। আর ট্রুথ কমিশনকে আদালাত অবৈধ ঘোষণা করলেও যারা টাকা জমা দিয়েছেন তাদের টাকা ফেরত দেয়ার কোনো নির্দেশ দেয়নি।

ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিস লিমিটেডের পরিচালক প্রশান্ত কুমার হালদার (পিকে হালদার)-এর বিরুদ্ধে তিন হাজার ৬০০ কোটি টাকা দেশের বাইরে পাচারের অভিযোগ আছে। দুদক তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। তিনি এখন দেশের বাইরে থাকলেও দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করে ওই টাকা বিনিয়োগকারীদের ফেরত দিতে চান বলে হাইকোর্টে আবেদন করেছেন। আদালত তার দেশে ফেরার দিন-ক্ষণ জানতে চেয়েছেন। জানতে চেয়েছেন, ফ্লাইট নাম্বার। তিনি দেশে ফিরে এলে তিনিসহ সবপক্ষের উপস্থিতিতে আদেশ দেবেন বলে আদালত জানিয়েছেন।

দুদকের আইনজীবী খুরশিদ আলম খান বলেন, ‘‘আদালত তাকে একটা সুযোগ দিয়েছেন দেশে ফেরার৷ কিন্তু দেশে ফিরলে বিমান বন্দরেই তাকে আটক করা হবে। কারণ, তার বিরুদ্ধে মামলা আছে। আটকের পর তাকে আদালতে হাজির করা হবে। আর তিনি টাকা ফেরত দিলেও মামলা এবং শাস্তি থেকে রেহাই পাবেন না।’’

দুদক জানায়, তাদের উদ্যোগের মধ্যে এখন এগিয়ে আছে মোরশেদ খান ও তার পরিবারের সদস্যদের হংকংয়ে পাচার করা ৩২১ কোটি টাকা ফেরত আনা। এর মধ্যে প্রথম ধাপে ১৬ কোটি টাকা ফেরত আনার জন্য হংকংয়ের অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে মিউচ্যুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠিয়েছে দুদক।

বিএনপি নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ৯ কোটি টাকা ফ্রিজ করা হয়েছে। গিয়াসউদ্দিন আল মামুন এবং তার ভাই হাফিজ ইব্রাহিমের টাকাও উদ্ধারের চেষ্টা চলছে বলে দুদক জানায়। খুরশিদ আলম বলেন, ‘‘আরো বেশ কিছু উদ্যোগ ও মামলা আছে।’’

এদিকে হলমার্কের কাছ থেকে ১৩ কোটি টাকা আদায়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল দুদক৷ তবে তা আইনি প্রক্রিয়ার কারণে আটকে আছে৷

তবে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার ব্যাপারে উদ্যোগকে যথেষ্ট মনে করেন না ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তার মতে, এই ক্ষেত্রে দেশের এবং আন্তর্জাতিক আইনের কিছু জটিলতা আছে। এটা অবশ্য দুই দেশ আইনগত চুক্তি সাক্ষর করে এগিয়ে নিতে পারে। কিন্তু সেই উদ্যোগ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তেমন দেখা যাচ্ছে না বলে মনে করেন তিনি৷ তিনি বলেন, ‘‘এগুলো যারা করবেন, তারা অনেক প্রভাবশালী। তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্যই উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না৷’’

পাচার করা যে অর্থ ফেরত আনা হবে, আইনে তার দ্বিগুণ জরিমানার বিধান আছে৷ এছাড়া চার থেকে ১২ বছরের শাস্তির বিধানও আছে৷ এই জরিমানা ও শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে পাচার বন্ধ করা যাবেনা। কারণ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে অন্যরাও পাচার করা অর্থের কিছু ফেরত দিয়ে বৈধতা নেবে এবং একই কাজ অব্যাহত রাখবে বলে মনে করেন তিনি।

চেষ্টা করেও এ বিষয়ে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের বক্তব্য জানা যায়নি৷ তবে গত ফেব্রুয়ারি মাসে দুদক কমিশন সভায় বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার ব্যাপারে আরো উদ্যোগী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তখন দুদক চেয়ারম্যান বলেছিলেন, ‘‘বিদেশে পাচার করে অনেকেই সেই সব দেশ অস্ট্রেলিয়া, কানাডায় থাকছেন। তাদের ইন্টারপোলের মাধ্যমে ফেরত আনার উদ্যোগ নেয়া হবে।’’

 

সূত্র: ডয়চে ভেলে

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close
Close