আলোচিত

মসজিদে বিস্ফোরণ: ৫০ হাজার টাকা ‘ঘুষ’ এবং ২৪টি জীবন

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : নারায়ণগঞ্জের মসজিদে এসি বিস্ফোরণের নেপথ্য কারণ হিসেবে গ্যাস লাইনের ছিদ্রকে দায়ী করা হচ্ছে। মসজিদ কমিটি বলছে ৫০ হাজার টাকা ঘুষ না দেয়ায় লাইন মেরামত করা হয়নি। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

শুক্রবার রাতে নারায়ণগঞ্জ শহরের পশ্চিম তল্লা এলাকার বায়তুস সালাত জামে মসজিদে বিস্ফোরণে এ পর্যন্ত ২৪ জন নিহত হয়েছেন। আরো অনেকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় আছেন বার্ন ইউনিটে। প্রথমে ধারণা করা হয়েছিলো নামাজের সময় এসি (শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র) বিস্ফোরণে এই দুর্ঘটনা ঘটে।

মসজিদটিতে ৬ টি এসি ছিলো৷ কিন্ত ফায়ার সার্ভিস প্রাথমিকভাবে বলেছে, মসজিদ লাগোয়া গ্যাস লাইনই এই দুর্ঘটনার কারণ। নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফিন সংবাদমাধ্যমকে শনিবার বলেছেন, ‘‘আমরা আগুন নেভানোর জন্য পানি দেওয়ার পর সেখানে বুদ্বুদ দেখতে পেয়েছি। এর অর্থ গ্যাস লিকেজ হচ্ছিল। মূলত পাইপটি ছিদ্র হয়ে গ্যাস নির্গত হচ্ছিল। এদিকে পুরো মসজিদ শীতাতপনিয়ন্ত্রিত হওয়ায় গ্যাস মসজিদের মধ্যেই আটকে ছিল।” তিনি আরো বলেন, ‘‘মসজিদের কোনো ফ্যান চালানোর সময় সুইচবোর্ড থেকে আগুনের ফুলকি বের হয়ে মসজিদের ভেতরে থাকা ছয়টি এসিতে আগুন ধরেছে বলে ধারণা করছি।”

মসজিদের সামনে গ্যাস লাইনে যে ত্রুটি ছিলো তা স্বীকার করেন মসজিদ কমিটির সভাপতি গফুর মিয়া। তিনি বলেন, ‘‘আমরা মাঝে মাঝেই নামাজ পড়তে গেলে গ্যাসের গন্ধ পেতাম। আর এটা মেরামতের জন্য আমারা স্থানীয় তিতাস গ্যাস অফিসে যোগাযোগও করেছিলাম। তারপরও কাজ হয়নি।’’

মসজিদ কমিটির সেক্রেটারি গ্যাসের লাইন মেরামতের জন্য কয়েক সপ্তাহ ধরে গ্যাস কর্তৃপক্ষের যোগাযোগ করে আসছিল বলে জানান তিনি। ‘‘এক পর্যায়ে মেরামতের জন্য তিতাস গ্যাসের লোকজন ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করে। আমরা এই ঘুষের টাকা যোগাড়ের চেষ্টা করছিলাম। স্থানীয়দের কাছ থেকে গ্যাস লাইন মেরামতের জন্য চাঁদা তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কিন্তু তার আগেই দুর্ঘটনা ঘটে যায়,’’ বলেন তিনি।

কিন্তু এই অভিযোগ অস্বীকার করেন নারায়ণগঞ্জ তিতাসের উপ মহা ব্যবস্থাপক মফিজুল ইসলাম। তিনি দাবি করেন, ‘‘মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে আমাদের গ্যাস লাইনে ত্রুটির কথা কখনোই জানানো হয়নি। আর মেরামতের জন্য কোনো ঘুষ দাবির অভিযোগও সত্য নয়।’’ গ্যাস লাইনের ত্রুটির কারণে মসজিদে বিস্ফোরণ হয়েছে ফায়ার সার্ভিসের এই দাবি মানতেও তিনি নারাজ। বলেন, ‘‘মাটি খুঁড়ে দেখতে হবে গ্যাস লাইনে কোনো ত্রুটি বা ছিদ্র আছে কিনা৷ তার আগে বলা যাবে না।’’

তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলী মো. মামুন বলেন, ‘‘দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে তদন্ত হচ্ছে তাই আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।” ঘুষ দাবির অভিযোগের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘‘তারা বলছেন। কিন্তু কে ঘুস চেয়েছে তা বলতে পারছেন না। তিনি কি তিতাসের কর্মচারী না দালাল। আমাদের তা সুনির্দিষ্টভাবে জানালে আমরা দেখব।”

ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘‘মসজিদে গ্যাসের কারণেই যে আগুন লেগেছে প্রাথমিক তদস্তে আমরা তা নিশ্চিত। তবে তা তিতাসের গ্যাস লাইন না সেখানে গ্যাসের খনি আছে তা তদন্ত করে দেখা যেতে পারে।’’

তিনি জানান, ‘‘আমরা মসজিদের ভিতরে গ্যাসের উপস্থিতি পেয়েছি, ফ্লোরের দুই টাইলস-এর মধ্যেও গ্যাস পেয়েছি। বিস্ফোরণের কয়েক ঘন্টা পরেও মসজিদের ভেতরে আমরা শতকরা ১৭ ভাগ মিথেন গ্যাস পেয়েছি। বাতাসে যদি শতকরা চার ভাগের বেশি মিথেন গ্যাস থাকে তাহলে হালকা বিস্ফোরণ হতে পারে। আর ১৬-১৭ ভাগের বেশি মিথেন থাকলে তা উচ্চ মাত্রার বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে অন্যান্য উপাদানের সাথে মিশে।’’

তিতাসের দাবির উত্তরে তিনি বলেন, ‘‘গ্যাস লাইন খুঁড়ে দেখার দরকার নাই। আমরা তো সেখানে গ্যাস পেয়েছি। এখন সেটা তিতাসের গ্যাস না হয়ে অন্য কোনো গ্যাস কিনা তা বিস্তারিত তদন্তে জানা যাবে। গ্যাস পেয়েছি এটাই বাস্তবতা।’’

এদিকে এই ঘটানায় পুলিশ বাদি হয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেছে। অবহেলার কারণে বিস্ফোরণ ও মৃত্যু হয়েছে বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে। কাউকে সরাসরি আসামি না করা হলেও তিতাস গ্যাস, ডিপিডিসি ও মসজিদ কমিটি দায়ী হতে পারে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

 

সূত্র: ডয়চে ভেলে

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close
Close