গাজীপুর

কাশিমপুর কারাগার থেকে ‘নিজের তৈরি মই বেয়ে পলায়ন’ করে কয়েদি আবু বক্কর

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : কারাগারের ভেতরে বসে মই তৈরি করে সেটি বেয়ে প্রধান ফটক পার হয়ে কারাগার থেকে পালিয়ে গেছেন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি আবু বক্কর ছিদ্দিক। তিনি আগে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ছিলেন। পালানোর সময় তাঁর পরনে কয়েদির পোশাক ছিল না। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কারারক্ষীরা কেউ বাধাও দেননি। তাঁরা মই বানাতে দেখলেও জানতে চাননি এটা দিয়ে কী হবে।

কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ থেকে কয়েদি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় সরকারের গঠিত তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে। তদন্ত কমিটি সিসি ক্যামেরার ফুটেজ, ৪২ জন কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাক্ষ্য ও অন্যান্য নথি পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন তৈরি করেছে। অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল আবরার হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের কমিটি ৮ ও ১৩ আগস্ট কারাগার পরিদর্শন করে। কমিটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তাদের প্রতিবেদন জমাও দিয়েছে।

জানা যায়, বন্দী পালানোর ঘটনাটি জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে জানানো হয় ১৬ ঘণ্টা পর, তাও ই-মেইলে। ঘটনার দিন কারাগারের ৪৮টি সিসিটিভি ক্যামেরার মধ্যে ২৭টি অচল ছিল। সার্চ লাইটও ছিল অকেজো।

তদন্ত কমিটি বলছে, জেল সুপার ও জেলার যদি কারা অভ্যন্তরে আরও তদারকি করতেন এবং ডেপুটি জেলাররা যদি তাঁদের নির্দিষ্ট এলাকাগুলো নিয়মিত ঘুরতেন এবং কারারক্ষীরাও যদি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতেন, তাহলে কারাগারের ভেতরে মই থাকত না।

এ ঘটনায় দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিবকে নির্দেশ দিয়েছি। এ ছাড়া এর আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে ও শাস্তির সুপারিশ করা হয়েছিল, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

যেভাবে পালিয়েছেন বন্দী
কয়েদি আবু বক্কর ছিদ্দিক ৬ আগস্ট বেলা সোয়া ১১টায় কাঁধে একটি মই নিয়ে সাধারণ পোশাকে ব্রহ্মপুত্র ভবনের প্রধান ফটক দিয়ে বের হন। সিসিটিভিতে দেখা যায়, ওই সময় তাঁর আশপাশে দায়িত্বরত কারারক্ষীরা ঘোরাফেরা ও গল্প করছেন। ছিদ্দিক মইটি কাঁধে নিয়ে ব্রহ্মপুত্র ভবনের বাইরের ফটক দিয়ে বেরিয়ে মাঠের ভেতর দিয়ে কারাগারের মূল ফটকের দিকে যান। মূল ফটকে দায়িত্বরত কারারক্ষীর সামনে দিয়ে মই নিয়ে গেলেও তিনি বাধার সম্মুখীন হননি। দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে মই পড়ে থাকতে দেখে একজন কারারক্ষী মইটি কয়েদি গোয়েন্দা জাকিরকে দিয়ে কেস টেবিলে পাঠান। সে সময় কেস টেবিলে সর্বপ্রধান কারারক্ষী বসা ছিলেন। তদন্ত কমিটির ঘটনার বর্ণনা থেকে এ তথ্য জানা যায়।

ইচ্ছে করে সময়ক্ষেপণ
পুরো ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে, কারারক্ষী থেকে শুরু করে জেল সুপার—সবাই বন্দী পালানোর ঘটনাটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে জানাতে বিলম্ব করেছেন। কেস টেবিলে বসা সর্বপ্রধান রক্ষী আবুল কালাম আজাদ, গোয়েন্দা সহকারী প্রধান রক্ষী আহাম্মদ আলী, গোয়েন্দা কারারক্ষী হক মিয়া কেউই মইটি এভাবে রাখাসহ বন্দীর পালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে কিছুই জানাননি। একজন কয়েদি কম থাকায় দুপুরে গণনায় তা ধরা পড়লেও সর্বপ্রধান কারারক্ষী বিষয়টি জেলার বা জেল সুপারকে জানাননি। সন্ধ্যায় তালা বন্ধ করার সময় গণনায় একজন বন্দী কম পড়লে তখন বিষয়টি ডেপুটি জেলার ও জেলার জানতে পারেন। আর গাজীপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে ঘটনা সম্পর্কে জানানো হয় পরদিন।

তদন্ত কমিটি জানতে পারে, ওই বন্দী যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত একজন কয়েদি হওয়া সত্ত্বেও কখনো কয়েদি পোশাক পরতেন না। মৃত্যুদণ্ড থেকে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত বন্দী আবু বক্কর ছিদ্দিকের ২০১৫ সালে একবার নিখোঁজ হওয়ার নজির থাকা, অন্তর্মুখী স্বভাবের কারণে অন্য বন্দীদের থেকে আলাদা থাকার প্রবণতা এবং কয়েদি পোশাক না পরিধানের অভ্যাস থাকলেও কারা কর্তৃপক্ষ তাঁর ব্যাপারে নজরদারি বা তাঁকে কয়েদি পোশাক পরতে বাধ্য করার জন্য কোনো বিশেষ পদক্ষেপ নেয়নি।

দায়ী যাঁরা
তদন্ত কমিটির মতে, পুরো ঘটনায় কারাবিধি ও সরকারি চাকরি বিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হয়েছে। এ ঘটনার জন্য কাশিমপুর কারাগারের জ্যেষ্ঠ জেল সুপার জাহানারা বেগমসহ মোট ২৫ জনকে দায়ী করা হয়েছে। দোষীদের বিরুদ্ধে কারাবিধি ও সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা অনুয়ায়ী ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে দোষীদের সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।

জানতে চাইলে জাহানারা বেগম বলেন, ‘এ ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে আমি দায়ী নই। তবে যেহেতু আমার কারাগারের ঘটনা, কিছুটা দায়ভার আমার আছে। তবে জেল সুপার বলেই সব অন্যায়ের দায় তো আমার ওপর বর্তায় না।’

কমিটির মতামত ও সুপারিশ
তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, কয়েদি আবু বক্কর ছিদ্দিক মই নিয়ে পালাতে সক্ষম হওয়ায় যথাযথ নিরাপত্তার অভাব যে ছিল, তা প্রমাণিত। কারাগারের সবাই দায়িত্ব ও কর্তব্যে চরম অবহেলা করেছেন ও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। কমিটি কারাগারের সব সিসিটিভি ক্যামেরা সচল রাখা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও এসব ক্যামেরার ফুটেজের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে বলেছেন। এ ছাড়া নিরাপত্তাসংক্রান্ত কোনো অবকাঠামোগত ত্রুটি থাকলে মেরামত বা সংস্কারের ব্যবস্থা করা, কয়েদি পোশাক পরা নিশ্চিত করাসহ মোট ১৬টি সুপারিশ করেছে কমিটি।

 

আরো জানতে…

কারাগার থেকে কয়েদি পলায়ন, তদন্ত কার্যক্রম শুরু

কারাগার থেকে কয়েদি পলায়ন: ৬ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা, ৬ জন বরখাস্ত

কাশিমপুর কারাগার থেকে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এক কয়েদি ‘উধাও’

সূত্র: প্রথম আলো

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close
Close