আলোচিতবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

কোন মাস্ক কেমন সুরক্ষা দেয়

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : বিজ্ঞানের বার্তা পরিষ্কার: ফেস মাস্ক করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে ও জীবন বাঁচাতে পারে।

প্রাথমিকভাবে ১৯৪টি দেশ নিয়ে করা একটি বিশ্লেষণ বলছে, যে স্থানে মাস্ক পরার ব্যাপারে নির্দেশনা দেয়া হয়নি, সেখানে প্রথম কেস শনাক্ত হওয়ার পর থেকে মাথাপিছু করোনাভাইরাসে মৃতের সংখ্যা ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। অথচ যেসব দেশে মাস্ক পরার নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল সেখানে এটি ছিল মাত্র ৭ শতাংশ।

ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের একটি মডেল ভবিষদ্বাণী করে বলেছে, নভেম্বরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ৪৫ হাজার করোনাভাইরাস সংক্রান্ত মৃত্যু ঠেকাতে পারে যদি ৯৫ শতাংশ জনগণ মাস্ক ব্যবহার করে। যদিও সব মাস্ক সমানভাবে সুরক্ষা দিতে পারে না। একটি আদর্শ ফেস মাস্ক হাঁচি-কাশির ফলে শ্বসনতন্ত্র থেকে নির্গত বড় ড্রপলেট আটকে দিতে পারে, প্রাথমিকভাবে এ উপায়েই একজনের কাছ থেকে ভাইরাস অন্যজনে ছড়ায়। এছাড়া বাতাসে ভাসমান ছোট কণা যাকে অ্যারোসল বলা হয়, যেটি নির্গত হয় মানুষের কথা বলা এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মেডিকেল মাস্ক ব্যবহারের নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্যকর্মী, বয়স্ক মানুষ, রোগাক্রান্ত মানুষ এবং যারা করোনাভাইরাসের টেস্টে পজিটিভ এসেছে কিংবা উপসর্গ দেখা গেছে তাদের। আর যারা এসব ক্যাটাগরিতে পড়বে না তারা ফেব্রিকের মাস্ক ব্যবহার করবে। এদিকে সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনও সাধারণ মানুষের জন্য কাপড়ের তৈরি মাস্ক ব্যবহারের নির্দেশনা দিয়েছে।

অবশ্য কাপড়ের তৈরি মাস্কগুলোও নানা ধরনের হয়ে থাকে। বিভিন্ন মাস্কের কার্যকারিতা ভিন্ন হয়। ড. রামজি আসফোর বলেন, এটা নির্ভর করে গুণগত মানের ওপর। এখন আপনি যদি মিসরীয় কটন শিট দিয়ে মাস্ক তৈরি করেন, সেটি অবশ্যই বাজেভাবে বোনা সস্তা টি-শার্টের তৈরি মাস্কের চেয়ে ভিন্ন হবে।

কয়েক মাস ধরে বিজ্ঞানীরা করোনাভাইরাসকে আটকানোর জন্য কার্যকর মাস্ক তৈরি করতে উপযুক্ত উপকরণের মূল্যায়নের কাজ করছেন।

এন৯৯ ও এন৯৫ মাস্ক স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যবহার করতে বলার পেছনে উপযুক্ত কারণ রয়েছে। এর নাক ও মুখ দুটোই খুব শক্তভাবে সিল করা থাকে, ফলে খুব অল্প পরিমাণ ভাইরাল পার্টিকেল ভেতরে-বাইরে আসা-যাওয়া করতে পারে। এতে এমন ব্যবস্থা রয়েছে যেন এটি বাতাসে চলাচলকারী রোগজীবাণুকে ফিল্টার করতে পারে।

গত মাসে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে জার্নাল অব হসপিটাল ইনফেকশনে। যেখানে ১০টি মাস্ককে মূল্যায়িত করা হয়েছে বাতাসে চলাচলরত করোনাভাইরাসের কণাকে ফিল্টার করতে পারার ক্ষমতা অনুসারে।

গবেষকরা দেখলেন এন৯৯ মাস্ক উচ্চমাত্রায় দূষিত পরিবেশে এক্সপোজারের ২০ মিনিট পর সংক্রমণের সম্ভাবনা ৯৪ থেকে ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে। এন৯৫ মাস্কও অনেকটাই একই সুরক্ষা দিতে পারে। এই মাস্কের নাম মূলত অ্যারোসল ফিল্টারিংয়ের ক্ষেত্রে এর ৯৫ শতাংশ কার্যকরীতে নির্দেশ করে।

এছাড়া সম্প্রতি করা আরো একটি গবেষণা বলছে, এন৯৫ মাস্ক সার্জিক্যাল মাস্কের চেয়ে অধিক মাত্রায় সুরক্ষা দিতে পারে। সার্জিক্যাল মাস্কগুলো ননওভেন ফেব্রিক দ্বারা তৈরি। তাই এগুলো সাধারণত স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য নিরাপদ, যারা মূলত এন৯৯ কিংবা এন৯৫ মাস্ক ব্যবহারের সুযোগ পান না।

এপ্রিলে করা একটি গবেষণা দেখিয়েছে, সার্জিক্যাল মাস্ক একাধিক মানুষের মাঝে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কমাতে ভূমিকা রেখেছে।

২০১৩ সালের করা আরেকটি গবেষণা বলছে, সাধারণত সার্জিক্যাল মাস্ক অ্যারোসল ভাইরাস আটকানোর ক্ষেত্রে ঘরে তৈরি মাস্কের চেয়ে প্রায় তিন গুণ অধিক সক্ষমতাসম্পন্ন। তবে স্বাস্থ্যকর্মীদেরই সবার আগে এগুলো পাওয়া দরকার।

রামজি বলেন, আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা হচ্ছে কাপড়ের মাস্ক, কারণ আমরা চাই না স্বাস্থ্যকর্মীরা বঞ্চিত হোক।

ঘরে তৈরি হাইব্রিড মাস্ক নিরাপদ

সাম্প্রতিক একটি গবেষণাপত্র বলছে, হাইব্রিড মাস্ক, যেখানে দুই স্তরের ৬০০-থ্রেড-কাউন্ট কটনের সঙ্গে অন্য উপাদান যেমন সিল্ক, শিফন কিংবা ফ্ল্যানেল যুক্ত করে তৈরি করা হয় তা ৮০ শতাংশের বেশি ছোট কণা (৩০০ ন্যানোমিটারের কম) এবং ৯০ শতাংশের বেশি বড় কণা ফিল্টার করতে পারে (৩০০ ন্যানোমিটারের বড়)।

তারা দেখেছেন কটন ও শিফনের মিশ্রণ অধিক সুরক্ষা দিতে পারে। তারপর আসে কটন ও ফ্ল্যানেল, কটন ও সিল্ক এবং প্রাকৃতিক সিল্কের চারটি স্তর।

গবেষকরা বলছেন, এই বিকল্পটি হয়তো ছোট কণা ফিল্টার করার ক্ষেত্রে এন৯৫ মাস্কের চেয়ে অধিক কার্যকর। যদিও বড় কণার ফিল্টার করার ক্ষেত্রে তারা অতটা ভালো নয়।

এই দলটি আরো যা দেখেছে তা হলো, দুই স্তরেরর ৬০০-থ্রেড-কাউন্ট কটন কিংবা শিফনের দুটি স্তর ছোট কণার ফিল্টার করার ক্ষেত্রে সার্জিক্যাল মাস্কের চেয়ে বেশি কার্যকর।

কটন কিংবা সিল্কে তিনটি স্তরও উচ্চমাত্রায় সুরক্ষিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেয়া নির্দেশনা অনুসারে তিনটি স্তরসমৃদ্ধ ফেব্রিক মাস্ক: ভেতরের স্তর শোষণের কাজ করে, মাঝের স্তর ফিল্টারের কাজ এবং একটি বাইরের স্তর পলিয়েস্টারের মতো শোষণহীন উপাদান থেকে তৈরি।

পাশাপাশি জানা গেছে, তিন স্তরের সিল্ক কিংবা ১০০ ভাগ কটন টি-শার্ট মেডিকেল-গ্রেড মাস্কের মতোই সমান সুরক্ষা দেয়। বিশেষত সিল্কের ইলেকট্রোস্ট্যাটিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা কিনা ছোট ভাইরাল কণাকে আটকানোর ক্ষেত্রে সাহায্য করে। আবার ভ্যাকুয়াম ক্লিনার ব্যাগ এক্সপোজারের ৩০ সেকেন্ড পর ঝুঁকি কমায় ৮৩ শতাংশ পর্যন্ত এবং ২০ মিনিট পর কমায় ৫৮ শতাংশ পর্যন্ত।

টি টাওয়াল এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল বালিশের কাভার পরবর্তী সেরা বিকল্প। তবে গবেষকরা বলছেন, সুরক্ষার জন্য টি টাওয়ালগুলো শক্তভাবে বোনা উচিত।

আপনার নাক-মুখের চারপাশে স্কার্ফ বেঁধে রাখা সেভাবে কার্যকর নয়, যদিও কোনো কিছু না থাকার চেয়েও এ রকম কিছু থাকা ভালো। অন্যদিকে এক স্তরের কটনের তৈরি মাস্ক এক স্তরের পেপারের তৈরি মাস্কের চেয়ে ভালো।

 

সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close
Close