আলোচিতসারাদেশ

বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়া দ্বন্দ্ব: সমাধান কী?

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : ভাড়া না দেয়ায় ঢাকার ভাড়াটিয়া শিক্ষার্থীদের মালামাল থেকে শুরু করে এমনকি সার্টিফিকেট ফেলে দিয়েছেন দুই বাড়িওয়ালা। এই অমানবিকতা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। ভাড়া নিয়ে বাড়ি মালিক ও ভাড়াটিয়াদের যে দ্বন্দ্ব চলছে তার সমাধান কী?

ঠিক এমন ঘটনাই ঘটেছে রাজধানীর দু’টি বাড়িতে। একটি বাড়িতে ১৩৮ জন শিক্ষার্থী থাকতেন৷ আর অন্যটিতে নয়জন। এর মধ্যে চারজন এইচএসসি পরীক্ষার্থীর মূল রেজিস্ট্রেশন কার্ডও ফেলে দেয়া হয়েছে, যে পরীক্ষাটি করোনার কারণে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেকের সারা জীবনের অর্জন করা সার্টিফিকেটও আছে এই তালিকায়।

বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, ‘‘এটা ভয়াবহ রকমের অপরাধ। করোনার এই সময়ে কোনো বাড়ি মালিক এই ধরনের অমানবিক আচরণ করতে পারেন না। ভাড়ার জন্য সার্টিফিকেট ডাস্টবিনে ফেলতে হবে? এই মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এই অমানবিক ঘটনার বিচারও হওয়া প্রয়োজন। একটা ছেলের সারা জীবনের অর্জন এভাবে ডাস্টবিনে যেতে পারে না।”

পূর্ব রাজাবাজারের ৪৩/ক পাটোয়ারি ভিলার পুরোটাই ছাত্রাবাস। মূল মালিকের কাছ থেকে ভবনটি ভাড়া নিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য ছাত্রাবাস তৈরী করেছিলেন খোরশেদ আলম। সেখানে ১৩৮ জন শিক্ষার্থী থাকেন৷ গত ২৬ মার্চ দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা হলে শিক্ষার্থীরা মার্চ মাসের ভাড়া দিয়ে বাড়ি চলে যান। এরপর ফিরে আসেননি৷ ছুটির মধ্যে ভাড়ার জন্য শিক্ষার্থীদের ফোনে চাপ দিচ্ছিলেন খোরশেদ। পরে ভাড়া না পেয়ে তাদের বইপত্র, শিক্ষা সনদ, কম্পিউটার এমনকি বিছানাপত্রও রুম ভেঙে বাইরে ফেলে দেন তিনি। ট্রাঙ্ক ভেঙে কাগজপত্র বের করেন। এর মধ্যে কিছু ডাস্টবিনে আর কিছু বিক্রিও করে দেন। খবর পেয়ে গত বুধবার কয়েকজন শিক্ষার্থী ঢাকায় চলে আসেন। এই অবস্থা দেখে তারা পুলিশের শরণাপন্ন হন। কলাবাগান থানায় সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সানজিদ ইফতেখার সোহান বাদি হয়ে একটি মামলা করেন। এই মামলায় খোরশেদ আলমকে গ্রেফতার করেছে কলাবাগান পুলিশ।

সানজিদ ইফতেখার সোহান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এই ভবনটিতে আমাদের সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০জন শিক্ষার্থী থাকেন। এর বাইরে অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী থাকতেন৷ তাদের সবার সার্টিফিকেটসহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, কম্পিউটার অনেক কিছুই ছিলো। এখন আমরা কিছুই পাচ্ছি না৷ আমরা খোরশেদকে বারবার বলেছি, করোনার এই সময়ে ভাড়া কিছুটা কমিয়ে দেন আমরা দিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু তিনি কিছুই কমাবেন না। এই আলোচনা চলতে চলতেই আমাদের সবকিছু তিনি ফেলে দিলেন। এখন আমরা আমাদের এসব সার্টিফিকেট কোথায় পাবো? সামনের দিনগুলোতো আমাদের অন্ধকার হয়ে গেলো।”

সোহানের দায়ের করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কলাবাগান থানার এসআই মোহাম্মদ বিপ্লব হোসেন বলেন, ‘‘খোরশেদকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। খোরশেদ এখন বলছে, টাকার জন্য সে এই কাজ করেছে। এখন সে ভুল বুঝতে পারছে। কিন্তু তার ভুল বোঝাতে তো আর শিক্ষার্থীদের সার্টিফিকেট, বইপত্র ফিরে আসবে না। এই মামলায় আরেক আসামী খোরশেদের ভাই সৈকতকে আমরা খুঁজছি।’’

এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে কলাবাগানের ৪/এ রুবি ভবনেও। বহুতল এই ভবনটির নিচতলার একটি ফ্ল্যাট ২৫ হাজার টাকায় ভাড়া নিয়ে নয়জন শিক্ষার্থী থাকতেন। এক মাসের অগ্রিমও তাদের জমা আছে। করোনার এই তিন মাসে গ্যাস, বিদ্যুৎ আর পানির বিল বাবদ প্রতি মাসে ৫ হাজার করে টাকাও বিকাশের মাধ্যমে মালিককে পাঠিয়েছেন। কিন্তু তারপরও বাড়ির মালিক মুজিবুল হক কাঞ্চন শিক্ষার্থীদের সার্টিফিকেট, কাগজপত্রসহ সবকিছু বের করে ট্রাকে করে পান্থপথের ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছেন। খবর পেয়ে শিক্ষার্থীরা ঢাকায় এসে বুধবার বিষয়টি জানতে পারেন।

এই ঘটনায়ও ঢাকা কলেজের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সজীব মিয়া বাদি হয়ে মালিকের বিরুদ্ধে কলাবাগান থানায় মামলা করেছেন। সজীব মিয়া ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমাদের সারা জীবনের সব অর্জন শেষ। আমাদের নয়জনেরই সব সার্টিফিকেট এখানে রাখা ছিলো। কম্পিউটার ছিলো। দামি বইপত্রও ছিলো। এখন কিছুই নেই। সবকিছু ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছেন মালিক। আমরা ডাস্টবিন তল্লাশী করে কিছু কাগজপত্র উদ্ধার করেছি।’’ তিনি জানান, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন আইডিয়াল কলেজের সাজ্জাদ হোসেন, মো. সোহেদ, সিটি কলেজের মো. তামিম ও তেজগাঁও কলেজের মো. অলিউল্লাহ। তারা এ বছর এইচএসসি পরীক্ষার্থী। এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের মূল রেজিস্ট্রেশন কার্ডসহ মূল্যবান সব জিনিসপত্র হারিয়েছেন এই চার শিক্ষার্থীই।

সজীবের দায়ের করা মামলাটির তদন্ত করছেন কলাবাগান থানার এসআই আখতার হোসেন। তিনি বলেন, ‘‘বাড়ি মালিককে গ্রেফতারের জন্য আমরা হণ্যে হয়ে খুঁজছি। তাকে পাওয়া যায়নি। এটা ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে আমরা তদন্ত কাজ চালাচ্ছি। শিগগিরই তাকে ধরতে পারবো বলে আশাবাদি আমরা।’’

পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার সাজ্জাদুর রহমান বলেন, ‘‘শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে চারজন এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থী তাদের কলেজের অধ্যক্ষের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। দ্রুত যেন তাদের রেজিস্ট্রেশন কার্ড পুনরায় দেওয়া যায় সে ব্যবস্থা করার অনুরোধ করেছি। আর যদি সেটা সম্ভব না হয় তাহলে বোর্ড চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানিয়েছি। তারা কথা দিয়েছেন এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন। আর আসামীদের গ্রেপ্তারের ব্যাপারে পুলিশ তৎপরতা চালাচ্ছে। সহসাই তারা ধরা পড়বেন। আমি নিজেও মনে করি, এ ব্যাপারে বাড়ি মালিকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিৎ।’’

‘আমরাই সবচেয়ে বড় ভিকটিম’

গ্রেফতারকৃত খোরশেদ আলমের স্ত্রী নাসরিন খোরশেদ দাবি করেছেন তার স্বামী ঐ বাড়ির মালিকের চাপেই এমন অমানবিক কাজ করেছেন। তিনি বলেন, ‘‘আমার স্বামী যেটা করেছে সেটা হয়তো ঠিক হয়নি। কিন্তু প্রতি মাসেই ভাড়ার জন্য বাড়ি মালিক আমাদের চাপ দিচ্ছিলেন। ভাড়া দিতে না পারলে আমাদের যে অগ্রিম দেওয়া আছে সেটা থেকেই কেটে নেবেন বলে শাসিয়ে দিয়েছেন।”

তিনি জানান প্রতিমাসে দুই লাখ টাকা আর আনুসঙ্গিক খরচ বাবদ আরো ৫০ হাজার টাকা করে তাদের কাছ থেকে কেটে নিচ্ছিল পূর্ব রাজাবাজারের ৪৩/ক পাটোয়ারি ভিলার মূল মালিক৷ গত তিন মাসে মোট সাড়ে সাতলাখ টাকা কেটেছেন।

‘‘এভাবে চলতে থাকলে তো আমাদের অগ্রিম দেওয়া ২৫ লাখ টাকার আর কিছুই থাকবে না। এখন সবাই আমাদের দোষারোপ করছেন। অথচ আমরাই এখানে সবচেয়ে বড় ভিকটিম,” বলেন নাসরিন খোরশেদ।

করোনা পরিস্থিতিতে ভাড়াটিয়াদের পাশাপাশি ঢাকা শহরের অনেক বাড়ির মালিকও সংকটে পড়েছেন বলে মনে করেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার (বিআইডিএস) সিনিয়র ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘‘কোভিড পরিস্থিতিতে ভাড়াটিয়া-মালিক সবাই সংকটে আছেন। হয়তো কেউ সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে একটি বাড়ি করেছেন। ওই বাড়ির ভাড়াই তার জীবন চলার একমাত্র উপার্জন। এখন সেই মালিক কী করবেন? তাই বলে তো সার্টিফিকেট ডাস্টবিনে ফেলতে পারেন না। তিনি সর্বোচ্চ ভাড়াটিয়ার সঙ্গে বসতে পারেন, আলোচনা করতে পারেন। ভাড়া কমাতে পারেন। কোন ভাড়াটিয়াকে বের করে দিতে হলেও একটা প্রক্রিয়া আছে। সেটা অনুসরণ করতে পারেন। ভাড়াটিয়াদেরও বুঝতে হবে, মালিকও সংকটে আছেন। তাই উভয় পক্ষ আলোচনা করেই সমাধানে আসতে হবে।”

এদিকে শনিবার সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এই বিষয়ে ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন করে বাড়ির মালিকদের সহনশীল হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘এ কথা সত্য যে, কোনো কোনো বাড়িওয়ালা আছেন ভাড়া থেকে প্রাপ্ত আয়ই তাদের একমাত্র উৎস। আবার তার উপর ব্যাংক লোনও থাকতে পারে। তাই আমি পরিস্থিতি বিবেচনায় দু’পক্ষকে ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে মানবিক হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’’

 

সূত্র: ডয়চে ভেলে

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close
Close