অর্থনীতিআলোচিত

দায়বদ্ধহীন বেসরকারি খাত

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : বিশ্বের যে দেশগুলোতে করোনা সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে সেই দেশগুলোতে সরকার একাই লড়াই করেনি। সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছে বড় বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, বিজনেস টাইকুনরা। তাঁরা তাঁদের সম্পদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ করোনা মোকাবেলার জন্য যেমন দান করেছেন, তেমনি তাঁরা দরিদ্র-বেকার, নিঃস্ব মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছে। সব দেশে এরকম উদাহরণ আছে, এমনকি পাশের দেশ ভারতে আমরা দেখি যে ধনীরা কিভাবে দরিদ্রদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু সেদিক থেকে বাংলাদেশ এক বিরল-ব্যাতিক্রম দেশ। আমাদের দেশে গত ৩ দশকে বড় বড় ব্যবসায়ী গ্রুপের উত্থান ঘটেছে, হাজার-হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন, তাঁরা দেশে-বিদেশে বাড়ি করেছেন, বাগানবাড়ি করেছেন, প্রমোদ বিলাসের জন্য তাঁদের টাকার অভাব নেই। তাঁরা যেভাবে জীবনযাপন করেন, তা পশ্চিমা দেশগুলোর বড়লোকরাও দেখে ভয় পান।

বাংলাদেশের বিত্তশালীরা অধিকাংশই করোনা সঙ্কটের সময়ে গরীব মানুষদের পাশে দাঁড়াননি এবং তাদের কোন দায়বদ্ধতা নেই। হাতে গোনা কয়েকটি ব্যবসায়ি গ্রুপ ছাড়া কেউই জনগনের পাশে দাড়ায়নি। জনগণের জন্য কোণরকম সহায়তার কর্মসূচীও ঘোষণা করেননি। অথচ শুরু থেকেই তাঁরা সরকারের প্রণোদনা, সরকারের ঋণ সহায়তা নেওয়ার জন্য প্রায় পাগল প্রায় অবস্থায় ছিল। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সেক্টর হলো গার্মেন্টস খাত এবং এই খাতের মালিকদের টাকা পয়সার অভাব নেই। এই টাকা পয়সা দিয়ে তাঁরা নির্বাচন করেন, তাঁদের বিলাসবহুল জীবন যাপন ঈর্ষনীয়। অথচ এই গার্মেন্টস মালিকরা করোনা সঙ্কটের পর শ্রমিকদের ন্যায্য বেতন দিতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছে। বাংলাদেশের গার্মেন্টস মালিকরা গার্মেন্টসের টাকা দিয়ে টেলিভিশনের মালিক হয়েছেন, সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন, আরো নানারকম গোপন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক হয়েছেন। কিন্তু তাঁদের গার্মেন্টস শ্রমিকদের ৩ মাসের বেতন দেওয়ার ক্ষমতা নেই? তাঁরা কি এতই গরীব? গার্মেন্টস মালিকদের এই দৈন্যতা সকলের কাছে হাস্যকর এক বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

শুধু গার্মেন্টস মালিকরা নন, বাংলাদেশের ফার্মাস্টিক্যালস কোম্পানিগুলো এবার করোনা সঙ্কটে ওষুধ তৈরির প্রতিযোগিতা করছে। এসকেএফ দেশের প্রথম রেমিডিসিভির উৎপাদন করেছে। ওষুধ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর মাঝে এই নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে বাজার দখলের। করোনা সঙ্কটের সময়ে শুধু হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিক্রি করেই যে মুনাফা অর্জন করেছে, সেই মুনাফাও বিপুল পরিমাণ বলে অর্থনীতির সাথে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। অথচ এই ওষুধ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো করোনার সঙ্কটে গরীব মানুষের পাশে নেই। স্কয়ার গ্রুপ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, ইনসেপ্টা বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান। এরা কেউই গরিব-দুঃখীদের পাশে দাঁড়িয়েছে বলে আমরা কোন তথ্য-প্রমাণ পাইনি। বরং বেক্সিমকো গ্রুপ কিছু পিপিই সরবরাহ করেছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে- এটুকুই তাঁদের সহায়তার হাত।

বাংলাদেশের আরো একটি বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হলো ট্রান্সকম গ্রুপ। যারা এসকেএফ ফার্মাসিটিকিউলস কোম্পানীর মালিক এবং একইসঙ্গে বাংলাদেশের ইলেক্ট্রনিকসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকানা এই ট্রান্সকমের হাতে। অথচ এই গ্রুপও কোন সহায়তা দেয়নি। আকিজ গ্রুপও বাংলাদেশের অন্যতম বড় শিল্প গ্রুপ। এই গ্রুপকেও আমরা দেখেনি গরীবদের পাশে দাঁড়িয়ে ত্রাণ তৎপরতায় অংশগ্রহণ করতে। প্রাণ গ্রুপ বাংলাদেশের আরেকটি বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং তাঁরা বহুমাত্রিক শিল্প উদ্যোগের সাথে জড়িত থাকলেও এই দূর্যোগে তাঁদের আমরা পাশে পাইনি।

উল্লেখ্য যে, কৃষি ক্ষেত্রেও প্রাণ কোম্পানির অনেক কাজ আছে, কিন্তু তাঁরা কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো, ধান কাটা বা কৃষকদের নির্ধারিত মূল্য নিশ্চিতে সহায়তা করায় কোন উদ্যোগ বা সহযোগিতায় আমরা প্রাণ গ্রুপকে দেখিনি।

এসিআই দেশের একটি বৃহৎ ফার্মাসিটিক্যাল কোম্পানি এবং একই সাথে এসিআই অন্যান্য শিল্প উদ্যোগের সাথে জড়িত। তবে এই করোনা সঙ্কটের সময়েও তাদেরকেও সাধারণ মানুষের দেখিনি।

বাংলাদেশের বড়লোকরা গরীবদের সাহায্য করতে কেন কুণ্ঠাবোধ করেন, সে বোধ নেই। বরং গরীব মানুষদের সাহায্য করতে গিয়ে তাঁরা এমন ভাব করেন যে, তাঁদের চেয়ে গরীব মানুষ বোধ হয় আর কেউ নেই। আর একারণেই বলা হয় যে, বাংলাদেশে সত্যিকারের পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটেনি, বাংলাদেশে যারা পুঁজিবাদী তাঁরা হলেন লুটেরা। অধিকাংশই ব্যাংকের টাকা দিয়ে বিত্তশালী হয়েছেন আর সেজন্য সামাজিক দায়বদ্ধতা বলে যে একটি জিনিস আছে তা তাঁরা জানেন না।

 

সূত্র: বাংলা ইনসাইডার

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close
Close