মুক্তমত

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস ও সংবাদপত্র -সাংবাদিকদের স্বাধীনতা

অধ্যাপক শামসুল হুদা লিটন : আজ ৩ মে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। প্রতিবছর এই দিনে সারাবিশ্বে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস পালিত হয়েছে।

জাতিসংঘ ২০২০ সালে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে -‘জার্নালিজম উইদাউট ফিয়ার অর ফেভার ” বা ভয় ও পক্ষপাতমুক্ত সাংবাদিকতা’।

গত বছর, ২০১৯ সালে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যমের শ্লোগান ছিলো -‘মিডিয়া ফর ডেমোক্রেসি; জার্নালিজম অ্যান্ড ইলেকশন্স ইন টাইমস ডিজইনফরমেশন’। প্রতি বছরই একটি প্রতিবাদ্য বিষয় থাকে। এই প্রতিবাদ্য বিষয়টি সাংবাদিকদের এক বছরের গাইডলাইন হিসেবে কাজ করে।

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের সূচনাঃ ১৯৯১ সালে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনেস্কোর ২৬ তম সাধারণ অধিবেশনের সুপারিশ মোতাবেক ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ সভায় ৩ মে তারিখটিকে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এর পর থেকে ৩ মে হলো বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। পহেলা মে শ্রমজীবি মানুষেরা পালন কর বিশ্ব শ্রমিক দিবস। এর এক দিন পর সাংবাদিক সমাজ পালন করেন বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। ১৯৯৪ সাল থেকে পৃথিবীর প্রতিটি দেশের গণমাধ্যম কর্মীরা যথাযোগ্য মর্যাদায় এ দিবসটি পালন করে আসছেন।

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসটিতে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও মুক্ত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার মৌলিক নীতিমালা অনুসরণ, বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মূল্যায়ন, স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ প্রতিহত করার শপথ নেয়ার পাশাপাশি ত্যাগি সাংবাদিকদের স্মরণ ও তাদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানানো হয়।

করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) পরিস্থিতিতে
এ বছর বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে আন্তর্জাতিকভাবে জাতি সংঘ কোন কর্মসূচি পালন করছে না। আমাদের বাংলাদেশেও জাতীয়ভাবে কোন কর্মসূচি পালিত হচ্ছে না।

গণমাধ্যমের ভূমিকা ও গুরুত্বঃ
গণমাধ্যম হলো ‘সমাজের দর্পণ- আয়না’। সংবাদপত্র জাতির বিবেক’। সংবাদপত্রকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ’।
সংবাদপত্র গণতন্ত্র, সুশাসন ও উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশ সহ বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রের উন্নয়নে স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং সংবাদপত্রের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গণমানুষের সার্বিক কল্যাণের জন্যই গণমাধ্যমের সৃষ্টি।

গণমাধ্যম গণমানুষের পরম বন্ধুও সারথি। অসহায় মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, যন্ত্রণা, হতাশা, দুর্দশা, বৈষম্য প্রভৃতি বিষয় তুলে ধরে সমাধানের পথ ত্বরান্বিত করে গণমাধ্যম। সমাজের দুর্নীতি, অপরাধ, অনাচার, অত্যাচার, অবিচার, অসাম্য, নিপিড়ন, নির্যাতন, মানববতা বিরোধী কর্মকান্ড সহ সমাজের সকল প্রকার অনিয়মের বিরুদ্ধে সংবাদপত্রের কন্ঠ হবে সোচ্চার ও বলিষ্ঠ।

জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণায় মত প্রকাশের স্বাধীনতাঃ ১০ ডিসেম্বর হলো বিশ্ব মানবাধিকার দিবস। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর প্যারিসে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে জাতি সংঘ মানবাধিকারের ঘোষণা প্রদান করে। এ ঘোষণাপত্রের ১৯ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেকেরই মতামত পোষণ ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতায় অধিকার রয়েছে। অবাধে মতামত পোষণ এবং রাষ্ট্রীয় সীমানা নির্বিশেষে যেকোনো মাধ্যমে ভাব ও তথ্য জ্ঞাপন, গ্রহণ ও সন্ধানের স্বাধীনতাও এ অধিকারের অন্তর্ভুক্ত।’ কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে জাতি সংঘের এ মানবাধিকার ঘোষণা অনুযায়ী কতটুকু বাক স্বাধীনতা ভোগ করছেন পৃথিবীর মানুষ। মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য এখনো সংগ্রাম করতে হচ্ছে। আর এ সংগ্রামের হাত ধরেই প্রতি বছর পালিত হয় বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস।

হুমকির মুখে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাঃ
বাংলাদেশ সহ বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আজ চরম হুমকির সম্মুখীন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের স্বাধীনতার বিষয়টি মূল্যায়ন করলেই ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠবে। বর্তমান বিশ্বে দেশে দেশে সাংবাদিক নির্যাতন ও সংবাদ মাধ্যমের উপর খড়গহস্ত বেড়েই চলছে। চলছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কন্ঠ চেপে ধরার প্রবনতা। মিডিয়া আজ শাসক শ্রেণি কতৃক চরমভাবে নিয়ন্ত্রিত। এ ব্যাপারে কয়েকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হয়ে উঠবে।

ব্রাসেলসভিত্তিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্টস (আইএফজে)-এর তথ্যমতে, ২০১৮ সালে সারা বিশ্বে মোট ৯৪ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী হত্যার শিকার হয়েছেন। তবে, ফ্রান্সের প্যারিসভিত্তিক সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক সংস্থা রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার-এর তথ্য অনুযায়ী, এ সংখ্যা ৮০ জন। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস ও ইউনেস্কোর এক যৌথ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৯৯০ দশকের পর থেকে প্রায় ১৩০০ সাংবাদিক নিহত হয়েছেন (দি টেলিগ্রাফ, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৮)। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ৩৪৮ জন সাংবাদিককে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বিভিন্ন গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি হয়েছেন ৬০ জন (ডয়চে ভেলে, ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৮)।

গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ দাবিদার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমের চরম বিষোদগার করেছেন। গণমাধ্যম নিয়ে টুইটারে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেছেন।

রোহিঙ্গা মুসলমানদের হত্যাও তাদের উপর সীমাহীন কষ্ট, নির্যাতন নিপিড়ন নিয়ে প্রতিবেদন করায় মিয়ানমারের শীর্ষ আদালত রয়টার্সের মেধাবী ও সাহসী দুই সাংবাদিককে সাত বছরের জেল দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি নির্মম ও জঘন্যতম ঘটনা ছিল, সৌদি দূতাবাসের ভেতরে সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ড। এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া আফগানিস্তান, ইরাক সিরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে অনেক সাংবাদিক হত্যার শিকার হয়েছেন। বাংলাদেশেও সাংবাদিকরা হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। সাংবাদিক সাগর- রুনি দম্পতি হত্যার বিচার আদৌ হয়নি। চূড়ান্ত প্রতিবেদন পিছিয়েছে ৭০ বার। বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিক হয়রানি খবর উঠে আসছে। মিডিয়া আজ যেনো কর্পোরেট মালিকদের দখলে। নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ায় চাকুরীচ্যুত হচ্ছেন অনেক সাংবাদিক। অনেক দেশে কালাকানুনের ফলে  সাংবাদিকদের স্বাধীনতা হুমকির সম্মুখীন।

 

লেখকঃ
শামসুল হুদা লিটন
সাংবাদিক, কবি, কলামিস্ট ও সহকারী অধ্যাপক
তারাগঞ্জ কলেজ
কাপাসিয়া, গাজীপুর।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close
Close