গাজীপুর

গার্মেন্টস মালিকদের প্রতারণার ফাঁদে সরকার

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : গার্মেন্টস মালিকরা তাঁদের অর্থলিপ্সার জন্য একের পর এক মিথ্যাচার এবং প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছেন। আর এই মিথ্যাচার আর প্রতারণার ফাঁদে পড়েছে সরকার। এর ফলে সবথেকে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হবে এদেশের সাধারণ জনগণকে। কারণ বাংলাদেশে যে এখন সামাজিকভাবে করোনা সংক্রমণের ব্যাপক বিস্তার হবে সেটা শুধুমাত্র গার্মেন্টস মালিকদের অমানবিক আচরণ, লোভ এবং অর্থলিপ্সার কারণে। এই গার্মেন্টসগুলো খোলা রাখার জন্য তাঁরা একের পর এক প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছেন এবং এই প্রতারণার ফাঁদে পড়ে সরকার গার্মেন্টস মালিকদের সব অন্যায় আবদার মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

দেখে নেয়া যাক গার্মেন্টস মালিকরা কি ধরণের প্রতারণা করছে-

১. ১৬ এপ্রিলের মধ্যে অনেক গার্মেন্টস মালিকরাই বেতন দেয়নি। শ্রম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গার্মেন্টস মালিকদের বলা হয়েছিল যে, বকেয়া বেতন ১৬ই এপ্রিলের মধ্যে পরিশোধ করতে। কিন্তু ১৬ এপ্রিলের মধ্যে অধিকাংশ গার্মেন্টস মালিকরা বেতন দেননি, বরং বেতন না দিয়ে তাঁরা গার্মেন্টস খোলার কৌশল গিয়েছেন- এটাই একটি প্রতারণার কৌশল বলছেন বিশ্লেষকরা। কারণ গার্মেন্টস যখন বন্ধ থাকবে শ্রমিকরা তখন অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকবে এবং গার্মেন্টস খোলা রাখলে শ্রমিকরা বেতন-ভাতার জন্যে আন্দোলন করবে না। অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে, গার্মেন্টস খোলার পেছনে মূল কারণ হলো বেতন-ভাতা না দেওয়া। এর পেছনে মূল কারণ বিদেশি বায়ারদের অর্ডার সেটি নয়।

২. লে অফ নিয়ে মিথ্যাচার করেছে গার্মেন্টস মালিকরা। কিছু কিছু গার্মেন্টস মালিক লে অফ ঘোষণা করেছেন। তাঁরা বলেছেন যে সরকারি আইন মেনেই তাঁরা লে অফ ঘোষণা করেছেন। অথচ সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে যে করোনা সঙ্কটের জন্য কোন গার্মেন্টসকে লে অফ করা যাবেনা। এখানেও গার্মেন্টস মালিকরা প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে।

৩. গার্মেন্টস মালিকরা বলছেন যে, শুধুমাত্র ঢাকায় যে সমস্ত শ্রমিক আছে, সেই সমস্ত শ্রমিকদেরকে কাজে আনা হবে। তাঁরা মঙ্গলবার প্রকাশ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে দাবি করেছেন যে, ঢাকার বাইরে থেকে কোন শ্রমিক আনা হবেনা। ঐ বৈঠক থেকে বের হয়ে গণমাধ্যমের সাথে আলাপকালেও গার্মেন্টসের দুই নেতা বলছেন যে, ঢাকার বাইরে থেকে কোন শ্রমিক আনা হচ্ছেনা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রত্যেকটি গার্মেন্টস শ্রমিককে ঐ গার্মেন্টস ম্যানেজাররা টেলিফোন করছেন এবং বলছেন যে যদি চাকরি বাঁচাতে চান, তাহলে আপনাদের অবশ্যই ঢাকায় আসতে হবে, নাহলে আপনাদের চাকরি থাকবে না। আজও গার্মেন্টস শ্রমিকদের ভিড়ে উপচে পড়েছে বিভিন্ন ফেরি-ঘাটে এবং তারা যে যেভাবে পারছে, সেভাবেই ঢাকায় আসছেন, এর ফলে সামাজিক সংক্রমণের বারোটা ইতিমধ্যেই বেজে গেছে।

৪. গার্মেন্টস মালিকরা সরকারের কাছে অঙ্গীকার করেছে যে, যারা আসবেন না তাঁদের কারও চাকরিচ্যুত করা যাবেনা। উপস্থিত না হলেও এপ্রিল মাসের বেতনের ৬০ শতাংশ দেয়া হবে। এটাকে প্রতারণা বলছেন গার্মেন্টসের সাথে সংশ্লিষ্টরা। শ্রমিকরা বলছেন যে, ম্যানেজাররা তাঁদেরকে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন যে, যদি তাঁরা ২ মে এর মধ্যে কারখানায় উপস্থিত হতে না পারে তাহলে তাঁদের চাকরি থাকবে না, বেতন তো দূরের কথা। অর্থাৎ তাঁরা যদি ঢাকায় না আসে, কর্মস্থলে যোগদান না করে বা বাড়িতে অবস্থান করে তাহলে বেতন তো দূরের কথা চাকরিটাও হারাবেন। অথচ গার্মেন্টস মালিকরা সরকারের কাছে বলে এসেছে যে, শ্রমিকদের ৬০ ভাগ বেতন দেয়া হবে। এটা আরেকটি প্রতারণা।

৫. তাঁরা বলছেন যে, স্বাস্থ্য বিধি মেনে তাঁরা গার্মেন্টস পরিচালনা করবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে যে, হাতে গোনা দু-একটি গার্মেন্টস ছাড়া অধিকাংশ গার্মেন্টসে স্বাস্থ্যবিধি তো দূরের কথা নূন্যতম জনস্বাস্থ্যের নিয়মনীতি মানছে না। এটা না মানার ফলে সামাজিক সংক্রমণের ভয়ানক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীগুলোকে ঘিরে।

৬. সবশেষ যে প্রতারণাটি গার্মেন্টস মালিকরা করছেন তা হলো, তাঁরা বলছেন যে, করোনা চিকিৎসা এবং করোনা পরীক্ষার জন্য পৃথক ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু বাস্তবে কোন গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি এখন পর্যন্ত এই ধরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

আর সবশেষ জানা গেছে যে, বিদেশি বায়াররা চলে যাবে বা অর্ডার নষ্ট হয়ে যাবে বলে যে আর্তনাদ করছেন, সেটাও একটি প্রতারণা।

কারণ বুধবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোন আলাপে সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন যে কোন গার্মেন্টসের অর্ডার বাতিল হবেনা। বিশ্বের বায়াররা বাংলাদেশের গার্মেন্টস মালিকদের মতো অমানবিক নয়, এরকম পরিস্থিতিতে তাঁরা অর্ডার বাতিল করার মতো অমানবিক আচরণ করবেন না- এটা অতীতেও প্রমাণিত হয়েছে। বরং বাংলাদেশে করোনা ঝুঁকি এবং করোনার সংক্রমণ অব্যহত থাকলে বায়াররা স্বাস্থ্যগত কারণে অর্ডার বাতিল করতে পারেন, এরকম নজির আমরা অতীতেও দেখেছি। সেরকম সম্ভাবনাও রয়েছে।

গার্মেন্টস মালিকরা যখন অতি চালাকি করছেন, এই অতি চালাকদের বিপদ হয় বিভিন্ন ভাবে এবং তারাও হয়তো এরকম একটি বিপদে পড়তে পারেন। তবে সরকারের সাথে গার্মেন্টস মালিকরা যে প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছেন, এই ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া দরকার বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মনে করেন।

 

সূত্র: বাংলা ইনসাইডার

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close
Close