আলোচিত

দর্জিতন্ত্রেই দেশের সর্বনাশ!

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প নিয়ে অনেকে অনেক আশাবাদ করেন। বলা হয় যে, আমাদের অর্থনীতির অন্যতম মেরুদণ্ড আমাদের গার্মেন্টস শিল্প এবং বিদেশ থেকে যে রপ্তানি আয় আসে তাঁর একটি বড় অংশ আসে গার্মেন্টস শিল্পের মাধ্যমে।

তবে দুষ্ট অর্থনীতিবিদরা বলেন অন্য কথা। তাঁরা বলেন যে, আমাদের যেটাকে গার্মেন্টস শিল্প বলা হয় সেটা আসলে টেইলারিং ইন্ড্রাস্টি বা সহজ বাংলায় দর্জিশিল্প। আমাদের গার্মেন্টস শিল্পের অধিকাংশ ফ্যাব্রিকস, কাপড়, সুতো এমনকি বোতামটি পর্যন্ত বিদেশ থেকে আমদানি করি এবং এই আমদানি ব্যয় এবং রপ্তানি ব্যয় যদি আমরা হিসেবনিকেশ করি তাহলে এই শিল্প থেকে আমাদের কি পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আসে বা আমাদের অর্থনীতিতে কি পরিমাণ ভূমিকা রাখে সেটা ভাববার বিষয় এবং তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। 

আমাদের গার্মেন্টস শিল্প যে অবদান রাখছে সেই কৃতিত্বের আসল দাবিদার শ্রমিকরা। যারা নূন্যতম মজুরীতে তাঁদের সমস্ত কিছু উজাড় করে দিয়ে এই গার্মেন্টস সামগ্রীগুলো টেইলারিং করছে এবং তার বিনিময়ে আমরা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছি। আমাদের গার্মেন্টস মালিকরা যাদেরকে এই দর্জিদের সর্দারও বলা যেতে পারে, তাঁরা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে দামি পাজেরো গাড়ি আর দামী বাড়ি বানিয়ে এই গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি না দিয়ে নিজেদের আরাম-আয়েশের জীবন যাপন করছেন এবং ইদানীং রাজনীতিতে এসেও খায়েস মেটাচ্ছেন।

সাম্প্রতিককালে সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, রাজনীতি দখল করে নিচ্ছে গার্মেন্টস মালিকরা এবং সেই প্রতিবেদনে এটাও দেখানো হয়েছে যে গার্মেন্টস মালিকরা কারা কারা মন্ত্রী-এমপি হয়েছেন।

তবে বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে এই দর্জিতন্ত্রের উদ্ভব হয়েছে। গণতন্ত্র বলতে আমরা বুঝি জনগনের শাষণ, যেখানে জনগনের ইচ্ছাই শেষ কথা এবং প্রজাতন্ত্রের মালিক হয় জনগন। কিন্তু যখন জনগনের ইচ্ছা এবং আকাঙ্খা পদদলিত হয় একটি বিশেষ পেশা গোষ্ঠীর ইচ্ছা অনিচ্ছাতে সিদ্ধান্তগুলো প্রতিফলিত হয় তখন সেটাকে আর গণতন্ত্র বলা যায় না।

সাম্প্রতিক সময় বাংলাদেশে তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি এবং সরকারে তাদের ভূমিকা লক্ষণীয়। আর এজন্যই আমরা এই ব্যবস্থাকে দর্জিতন্ত্র বলতে পারি। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময় যে এই দর্জি সর্দাররা প্রচণ্ড প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে তাঁর প্রমাণ পাওয়া যায় ধানমন্ডি আসনে উপনির্বাচনের মনোনয়ন দেখে। ধানমন্ডি খুব স্পর্শকাতর আসন একারণে যে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবন ‘বঙ্গবন্ধু ভবন’ সেখানে। এছাড়া আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাসভবন ‘সুধা সদন’-ও সেখানে। সেই বিবেচনা থেকে ধানমন্ডি আওয়ামী লীগের জন্য একটি স্পর্শকাতর জায়গা। এমন জায়গা থেকে যখন একজন গার্মেন্টস মালিক মনোনয়ন পান, তখন সেটা অবাক করা বিষয় হয়। তাছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন যেন গার্মেন্টস মালিকদের দখলে। প্রথমে যিনি মেয়র ছিলেন এবং তাঁর অকাল প্রয়াণে যিনি মেয়র হয়েছেন- তাঁদের সবার মূল পরিচয় তাঁরা গার্মেন্টস শিল্পের মালিক।

শুধু তাই নয়, এখন যদি মন্ত্রিসভার দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সেখানে বেশ কয়েকজন গার্মেন্টস মালিকদের দেখা যাবে। এছাড়া এমপিদের তালিকায় গার্মেন্টস মালিকদের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। আর এই বিবেচনায় অনেকে মনে করেন যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই দর্জিবাড়ির সর্দাররা বড় কর্তৃত্ব দখল করেছেন। আর এই কারণে দেখা যাচ্ছে যে, সরকারের বেশকিছু সিদ্ধান্তে তাঁরা প্রভাব বিস্তার করছেন।

বাংলাদেশে অনেক বড় বড় শিল্প পরিবার গড়ে উঠেছে এবং তাঁরা বিভিন্ন দুর্যোগ-দুর্বিপাকে সরকারের পাশে দাঁড়াচ্ছে। আমরা বসুন্ধরা গ্রুপের কথা বলতে পারি, আমরা স্কয়ার গ্রুপের কথা বলতে পারি, আমরা বেক্সিমকো গ্রুপের কথা বলতে পারি, আমরা বলতে পারি মেঘনা গ্রুপের কথাও। কিন্তু আমাদের গার্মেন্টস মালিকরা যেকোন দুর্যোগে প্রণোদনা ভিক্ষার জন্য আর্তনাদ করে ওঠেন এবং রাষ্ট্রের কৃপা এবং প্রণোদনা ছাড়া যেন তাঁদের কোন সহায়সম্বল নেই- এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করে আহাজারি করতে থাকেন। করোনাভাইরাস শুরুই হলো না, তাতেই গার্মেন্টস মালিকরা আর্তনাদ করে উঠেছে। এমন অবস্থা যেন তাঁদেরকেও ত্রাণ সরবরাহ করতে হবে, তাঁদের বাড়িতে চাল, ডাল, রসুন, পেঁয়াজ পৌঁছে দিতে হবে। এই গার্মেন্টস মালিকরা এত ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছেন যে, সরকার যখন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেন, তারপরেও তাঁরা তাঁদের গার্মেন্টস বন্ধ দেননা। তাঁরা যেন আলাদা রাজত্ব, আলাদা সরকার এবং এমন একটি পরিস্থিতি তাঁরা তৈরি করলো যখন সরকার সারাদেশে সামাজিক দুরত্ব নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী নামালেন, তখন সেই গার্মেন্টস মালিকরা শ্রমিকদেরকে ঢাকায় ফেরার জন্য টেলিফোন করলেন এবং ৫ এপ্রিল গার্মেন্টস খোলার সিদ্ধান্ত নিলেন।

আবার দেখুন, এই সিদ্ধান্ত যখন তীব্র জনরোষের মুখে পড়লো, তখন দর্জিবাড়ির প্রধান বিজিএমইএ- এর সভাপতি অডিও বার্তার মাধ্যমে গার্মেন্টস বন্ধ রাখার আহ্বান জানালেন। তাহলে কি দেশের প্রচলিত আইন বিধিবিধান তাঁদের জন্য প্রযোজ্য নয়? এটা অবশ্য নতুন নয়। কারণ এই বিজিএমইএ-এর ভবন তাঁরা গড়ে তুলেছিলেন অবৈধভাবে, হাতিরঝিলের লেক দখল করে। যেটা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত অবৈধ ঘোষণা দিয়েছেন এবং দীর্ঘদিন টালবাহানা করে তাঁরা সেটা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। বাংলাদেশে এই এক শ্রেনীর ব্যবসায়ী তৈরি হয়েছে, যারা শ্রমিকদের প্রাপ্য মজুরি না দিয়ে নিজেদের বিত্তের পাহাড় গড়েছেন এবং সেই পাহাড় দিয়ে তাঁরা মন্ত্রী-এমপি হচ্ছেন। তাঁদের জন্য যেন দেশের প্রচলিত আইনকানুন প্রযোজ্য নয়। বরং তাঁরা নিত্য নতুন আইন নিজেদের সুবিধামতো সৃষ্টি করছে, রাষ্ট্রের কাছে থেকে প্রণোদনার নামে ভিক্ষা নিচ্ছেন, আবার সেই ভিক্ষার টাকা যাঁদেরকে দেখিয়ে নিচ্ছেন অর্থাৎ সেই শ্রমিকদেরকেও ঠকাচ্ছেন।

বাংলাদেশে যে দর্জিতন্ত্র সৃষ্টি হয়েছে, সেই দর্জিতন্ত্র যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে তাঁর প্রমাণ সাম্প্রতিক সময়ে করোনা সঙ্কটের মাঝে গার্মেন্টস মালিকদের অমানবিক এবং গণবিরোধী আচরণ। আর এই কারণে বাংলাদেশে করোনা মহামারি হবার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আর তাই আমাদের উৎসে যেতে হবে, বাংলাদেশে তথাকথিত যে দর্জি শিল্প সেই দর্জি শিল্পের যে হোতা তাঁদেরকে এখনই আইনের আওতায় আনতে হবে এবং আমাদের সংবিধানের যে মূল সুর- আইন সবার জন্য সমান, সেই সমান আইন তাঁদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করতে হবে। একই সাথে তাঁরা যে রাষ্ট্রযন্ত্রের ঘাড় চেপে ধরেছে, সেই ঘাড় থেকে তাঁদেরকে নামাতে হবে। নাহলে আমাদের সামনে আরো বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।

 

 

সূত্র: বাংলা ইনসাইডার

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close
Close