আলোচিতজাতীয়স্বাস্থ্য

কোয়ারান্টিন না মানায় পরিস্থিতি খারাপের দিকে

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : দেশে বিদেশ ফেরতরা তথ্য লুকোচ্ছেন, করোনার কোয়ারান্টি নীতি মানতে চাচ্ছেন না। ফলে পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। এজন্য জরিমানা করার পরও পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।

বাংলাদেশে করোনায় প্রথম মৃত্যু ব্যক্তিও আক্রান্ত হয়েছেন বিদেশ ফেরত কারো কাছ থেকেই। করোনা ভাইরাস সংক্রমণে মৃত এই ব্যক্তি একজন পুরুষ বলে জানিয়েছেন আইইডিসিআর-এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আলমগীর।

রোগতত্ত্ব ইনস্টিটিউট- আইইডিসিআর জানিয়েছে বাংলাদেশে আরো চারজন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এ নিয়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ালো ১৪ জনে। নতুন আক্রান্তের মধ্যে একজন নারী ও তিন জন পুরুষ। আক্রান্তদের একজন আগে যারা আক্রান্ত ছিলেন তাদের পরিবারের সদস্য। বাকি তিন জনের দুজন ইটালি ও একজন কুয়েত থেকে এসেছেন।

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী গত এক সপ্তাহে প্রায় এক লাখ যাত্রী বিদেশ থেকে এসেছেন। ইটালি থেকে এসেছেন পাঁচশরও বেশি। তাদের মধ্যে সারাদেশে সেল্ফ কোয়ারান্টিনে রয়েছেন মাত্র দুই হাজার ৩১৪ জন।

মানা হচ্ছে না কোয়ারান্টিন

বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের কেউ কেউ কোয়ারান্টিন এড়ানোর জন্য পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। অন্তত তিন জনকে জরিমানা করা হয়েছে। মানিকগঞ্জে অষ্ট্রেলিয়া ফেরত একজনকে ১৫ হাজার টাকা, শরিয়তপুরে ইটালি ফেরত একজনকে ৫০ হাজার টাকা এবং টাঙ্গাইলে সিঙ্গাপুর ফেরত একজনকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। হবিগঞ্জে ফ্রান্স থেকে ফিরে একজন কোয়ারান্টিনে না গিয়ে বিয়েও করেছেন। পরে পুলিশ খবর পেয়ে দম্পতিকে কোয়ারান্টিনে পাঠিয়েছে। বৌভাতের অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে।

বাংলাদেশে প্রথম যিনি করোনায় মারা গেলেন, তিনি বিদেশে যাননি। আইইডিসিআর জানিয়েছে, বিদেশ থেকে আসা পরিবারের সদস্যের সংস্পর্শে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছেন তিনি। জানা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা ওই ব্যক্তি কোনো ধরনের কোয়ারান্টিনে থাকেননি। কিছুদিন বাংলাদেশে থেকে আবার যুক্তরাষ্ট্রে চলেও গিয়েছেন তিনি। ধারণা করা হচ্ছে, তার সংস্পর্শে থেকে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন সত্তোরোর্ধ্ব এই ব্যক্তি।

আইইডিসিআর জানায়, ওই মার্কিন প্রবাসী বাংলাদেশির করোনার লক্ষণ থাকার পরও তিনি রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের- আইইডিসিআর এর সাথে কোনো প্রকার যোগাযোগ ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গেছেন। তার তথ্য মার্কিন দূতাবাসে জানানো হয়েছে।

এখন পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত সন্দেহে ১৬ জন আইসোলেশনে আছেন। ৪২ জন প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারান্টিনে রয়েছেন। কিন্তু সেল্ফ বা হোম কোয়ারান্টিনের অবস্থা খুবই খারাপ। পরিসংখ্যান বলছে বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের সর্বোচ্চ তিন শতাংশও হোম কোয়ারেন্টাইনে যাননি। তারা দেশে আসার সময় শরীরে তাপ কমাতে উড়োজাহাজে প্যারসিটামল জাতীয় ট্যাবলেট খান বলেও কোয়ারান্টিনে যাওয়া যাত্রীরা জানিয়েছেন। তারা ওই ট্যাবলেট খান যাতে বিমানবন্দরে চেকের সময় তাদের শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকে।

এদিকে অষ্ট্রেলিয়ায় একটি প্রশিক্ষণে যাওয়া ৩০ জন বিচারক বাংলাদেশে ফিরে আসার পর বুধবার তাদের হোম কোয়ারান্টিনে পাঠানো হয়েছে।

বিনোদন ছুটি!

করোনা ভাইরাসের কারণে বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ৩১ মার্চ পর্যন্ত। এই বন্ধের জন্য আন্দোলনও হয়েছে, হাইকোর্টে রিটও হয়েছে। কিন্তু এখন অনেকেই এই ছুটি পেয়ে বাসায় থাকার পরিবর্তে বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরতে যাচ্ছেন। বিশেষ করে গত কয়েকদিনে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে দেশীয় পর্যটকের সংখ্যা বেড়ে গেছে। বেড়েছে সেখানকার হোটেল মোটেলে ভিড়। পরিস্থিতি সামাল দিতে পতেঙ্গা ও কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে যেতে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে কয়েকটি এলাকায় উত্তেজনাকর অবস্থা সৃষ্টির খবর পাওয়া গেছে। কোথাও কোথাও বিদেশফেরতদের আটক করে কোয়ারান্টিনে পাঠানোর ব্যবস্থা নিয়েছেন স্থানীয় লোকেরাই।

পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে

প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘‘সঠিক কোয়ারান্টিনই করোনা প্রতিরোধের উপায়। সরকারের ব্যবস্থাপনায় যেমন ত্রুটি আছে তেমনি বিদেশফেরতরাও এটা এড়াতে চেষ্টা করছেন। ফলে পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে।”

তিনি বলেন, ‘‘নজরদারিও দুর্বল৷ তা না হলে একজন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলেন, আবার চলেও গেলেন। তার পরিবারের সদস্য একজন মারা গেলেন। কিন্তু তিনি কোনো নজরদারির মধ্যে এলেন না। এরকম আরো অনেকেই নজরদারির বাইরে আছেন। যারা একেকজন করোনা ছড়াতে সুপার স্প্রেডারে পরিণত হতে পারেন।”

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এবং প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘‘এখন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে কাজে লাগানো দরকার। যারা কোয়ারান্টিন এড়াতে চাইবেন তাদের জোর করে তা মানতে বাধ্য করতে হবে। সবাইকে সচেতন হতে হবে। এই কোয়ারান্টিন নিজের জন্য যেমন প্রয়োজন তেমনি তার পরিবারে সদস্য এবং দেশের মানুষের কল্যাণেও প্রয়োজন। সবাইকে বলে দিতে হবে তারা যেন বিদেশ থেকে কেউ এসে কোয়ারান্টিনে না গেলে পুলিশকে খবর দেয়৷”

বাধ্যতামূলক কোয়ারান্টিন

আইইডিসিআর এর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেছেন, ‘‘এখন ইউরোপ থেকে আসা বন্ধ হয়েছে। এরইমধ্যে যারা এসেছেন আর যদি কেউ আসেন তারা সেল্ফ কোয়ারেন্টাইনে চলে যাবেন। যদি না যান তাহলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। সরকার এরইমধ্যে আইনগত ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। এই বিষয়ে আর কোনো সহানুভূতি দেখানোর সুযোগ নেই।”

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close
Close