টঙ্গীতে ভয়ংকর হয়ে উঠছে ছিনতাইকারী : আট বছরে কেড়ে নিয়েছে ১৬ প্রাণ

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : টঙ্গীতে দিন দিন ভয়ংকর হয়ে উঠছে ছিনতাইকারী দল। গত আট বছরে ছিনতাইকারীর হাতে প্রাণ হারিয়েছেন কমপক্ষে ১৬ জন। অভিযোগ রয়েছে, সন্ধ্যা হলেই টঙ্গীর কিছু সড়ক ও এলাকা চলে যায় ছিনতাইকারীদের দখলে। ছিনতাইয়ের পর থানায় অভিযোগ দিয়েও কোনো ফল পাওয়া যায় না। ছিনতাইকারীর হাতে ২০১২ সালে সর্বাধিক চারজন প্রাণ হারান। এ ছাড়া ২০১৪ ও ২০১৬ সালে একজন করে দুজন, ২০১৩ তিনজন, ২০১৫ ও ২০১৮ সালে দুজন করে চারজন, ২০১৯ সালে দুজন এবং সব শেষ গত শুক্রবার রাতে এলিট পেইন্টের কর্মকর্তা রাকিবুল ইসলাম প্রাণ হারান।

gazipurkontho
নিহত রাকিবুল ইসলাম।

স্থানীয় সূত্র জানায়, টঙ্গী শহরের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিন গড়ে ১৫-২০টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। ছিনতাইকারী দলে থাকে চার-পাঁচজন। তারা ছোরা, চাপাতিসহ ধারালো অস্ত্র নিয়ে ওত পেতে থাকে। সুযোগ বুঝে পথচারী ও রিকশা থামিয়ে অস্ত্রের মুখে মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যায়। বাধা দিলেই খুন-জখম করে। মূলত নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা ভয়ংকর হয়ে ওঠে। টঙ্গী স্টেশন রোড, কামারপাড়া রোড, নিমতলী রেলগেট, মধুমিতা রেলগেট, টেলিফোন শিল্প সংস্থা গেট, এরশাদনগর, পানির ট্যাংকি মোড়, মেঘনা পিনাকি গার্মেন্টের সামনে, নতুন বাজার রেলগেট, সিলমুন বাসস্ট্যান্ড, নিমতলী সেতু, কেরানিরটেক, ব্যাংক মাঠ বস্তি, মধুমিতা দরবার শরিফ মোড়, বউবাজার রেলগেট, আরিচপুর, মাছিমপুর তিতাস গ্যাস রোড, আরিচপুর রেললাইন, গরুর বাজার, মিলগেট, নামার বাজার, স্টেশন রোড, নওয়াগাঁও, তিস্তার গেট, দত্তপাড়া সমাজকল্যাণ রোড কবরস্থান, বনমালা রেলগেট, সফিউদ্দিন রোড, গাজীপুরা বাঁশপট্টি, মুদাফা প্রত্যাশা ব্রিজ, হোসেন মার্কেট, বাস্তুহারা, সাতাইশ রোড মোড়সহ আরো বেশ কয়েকটি স্থানে নিয়মিত ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।

ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে নিহত মো. কামরুল ইসলাম।

জানা যায়, ২০১২ সালের ১ জানুয়ারি ভোরে টঙ্গীর মধুমিতা রেলগেট এলাকায় ছিনতাইকারীর হাতে খুন হন ব্র্যাক কর্মকর্তা নেত্রকোনার মজিহাটি গ্রামের আবু জাহিদ সরকার (৫৫)। ওই ঘটনার ছয় দিন পর ৭ জানুয়ারি রাত সাড়ে ৯টার দিকে মিরাশপাড়ায় ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারান টঙ্গী বিসিকের দিশারী ওয়াশিং প্লান্টের কর্মচারী আক্তার হোসেন (২৮)। ওই বছরের ৫ মে রাত ৮টার দিকে টঙ্গীর সুরতরঙ্গ সড়কে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন দুই ব্যক্তি। আহত হন আরো তিনজন।

২০১৩ সালের ১৪ নভেম্বর ভোরে আরিচপুরে নিহত হন ঠিকাদার আলম বিল্লাহ (৫২)। ওই বছরের ১৫ আগস্ট সন্ধ্যায় টঙ্গীর পাগাড় এলাকায় ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে খুন হন স্যানিটারি মিস্ত্রি আসমত মিয়া (৩২)। সেই বছরের ২ সেপ্টেম্বর সাতাইশ এলাকায় নিহত হন বাংলালিংক মোবাইল কম্পানির মার্কেটিং কর্মকর্তা আহমেদ মোস্তফা।

২০১৪ সালের ১ জুন টঙ্গীর পাগাড় এলাকায় ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে খুন হন কাঁচামাল ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান জাহাঙ্গীর (৪০)। ২০১৫ সালের ১৬ মে রাতে এলমাদনগরে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে নিহত হন ট্রাকচালক বুলবুল আহমেদ। ১২ জুন রাতে টঙ্গী রেলস্টেশন রোডে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে খুন হন ঢাকার উত্তরার রিজেন্ট হাসপাতালের মার্কেটিং কর্মকর্তা আমির হোসেন রিংকু।

২০১৬ সালের ২৬ এপ্রিল রাতে টঙ্গীর ফায়ার স্টেশনের গলিতে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে খুন হন রনি (২৫) নামে এক পথচারী।

২০১৮ সালের ৬ আগস্ট রাতে দত্তপাড়ার শান্তিবাগ এলাকার প্রথম নিহত হন ভাঙ্গারি ব্যবসায়ী মো. রানা (৪৫)। ২৪ নভেম্বর রাতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গীর গাজীপুরা বাঁশপট্টি এলাকায় ছুরিকাঘাত করে অচেনা (৪০) এক ব্যক্তির সর্বস্ব ছিনতাই করে ছিনতাইকারী।

পরের বছর ছিনতাইকারীর হাতে খুন হন দুইজন। তাঁদের মধ্যে ৭ নভেম্বর রাত ৮টার দিকে আউচপাড়ার ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের সামনে পথচারী আলামিনকে (৩২) ছুরিকাঘাত করে টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনতাই করে ছিনতাইকারীরা। এ ঘটনার এক মাস আগে ৭ নভেম্বর ভোর ৩টার দিকে টঙ্গী পূর্ব থানার কলেজ গেট এলাকায় ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে খুন হন প্রাণ-আরএফএল কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম (৩৫)।

গত শুক্রবার রাতে টঙ্গী লেভেলক্রসিং এলাকায় ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারান এলিট পেইন্টের কর্মকর্তা রাকিবুল ইসলাম (২৫)। তিনি চট্টগ্রাম থেকে অফিসের কাজে ট্রেনে ঢাকায় যাচ্ছিলেন। ট্রেন টঙ্গী স্টেশনে থামার পর ছিনতাইকারী তার মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। তিনি দৌড়ে ছিনতাইকারীকে লেভেলক্রসিং এলাকায় ধরে ফেলেন। পরে ছিনতাইকারী তাঁকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে পালিয়ে যায়।

রাকিবুল ইসলাম হত্যায় জড়িত সন্দেহে এক ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছে টঙ্গী পূর্ব থানা পুলিশ।

শনিবার সন্ধ্যায় টঙ্গীর মরকুন এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে কুখ্যাত ছিনতাইকারী সুজনকে (২৫) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। রবিবার তাঁকে আদালতে নিয়ে ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। বিচারক শুনানি শেষে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। সুজন টঙ্গীর ব্যাংকের মাঠ বস্তির বাবর আলীর ছেলে।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, সুজন টঙ্গী রেলওয়ে এলাকার একজন কুখ্যাত ছিনতাইকারী। সুজনের বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক, ছিনতাই ও হত্যাসহ ছয়টি মামলা রয়েছে।

 

এ সংক্রান্ত আরো জানতে………

টঙ্গীতে ছুরিকাঘাতে ট্রেনযাত্রী হত্যায় জড়িত সন্দেহে ‘কুখ্যাত ছিনতাইকারী’ সুজন গ্রেপ্তার

টঙ্গী জংশনের প্লাটফর্মে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে ট্রেনযাত্রী নিহত

টঙ্গীতে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে প্রাণ গেল আরএফএল কোম্পানির এক কর্মকর্তার

 

 

সূত্র: কালের কন্ঠ