আইন-আদালতজাতীয়

সড়ক পরিবহন আইন: উচ্চ আদালতের রায় উপেক্ষিত

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : সড়ক দুর্ঘটনা রোধে জনস্বার্থে উচ্চ আদালতের দেয়া রায় ও নির্দেশনা উপেক্ষিত রয়েছে। নতুন আইন প্রণয়ন হলেও আদালতের দুটি রায় ও দুটি নির্দেশনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। দুর্ঘটনার জন্য আদালত নির্ধারিত ধারায় সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত হয়নি। প্রতিটি গাড়িতে স্থাপন করা হয়নি গতি নিয়ন্ত্রক যন্ত্র। এছাড়া ফুটপাতে মোটরসাইকেল চালানো বন্ধ ও হাইড্রোলিক হর্ন বন্ধের বিষয়ে হাইকোর্টের নির্দেশনাও পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। এসব কারণে যানবাহন চলাচলে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরেনি। গতি নিয়ন্ত্রণ না করায় দুর্ঘটনাও কমছে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে রায় প্রদানকারী সাবেক প্রধান বিচারপতি (আইন কমিশনের চেয়ারম্যান) এবিএম খায়রুল হক সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ২০০৭ সালে দৈনিক যুগান্তরের একটি রিপোর্ট আমলে নিয়ে সুয়োমোটো রুল দিই। সেই রুলের রায়ে দেশের প্রতিটি গাড়িতে গতি নিয়ন্ত্রক যন্ত্র স্থাপনের নির্দেশ প্রদান করা হয়। কিন্তু তা অদ্যাবধি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি।

এ প্রসঙ্গে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মেনেই নতুন সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়ন করা হয়। এর যথাযথ প্রয়োগ হলে দুর্ঘটনা রোধ ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা, উদাসীনতা ও অবহেলার কারণে বছরের পর বছর ধরে আদালতের এ সংক্রান্ত রায়গুলো উপেক্ষিতই রয়ে গেছে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, রাজনৈতিক মদদপুষ্ট প্রভাবশালীদের কারণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না। যদিও সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশনা পালন সবার জন্য বাধ্যতামূলক এবং তা অবজ্ঞা করা হলে সেটি হবে আদালত অবমাননার শামিল।

এ প্রসঙ্গে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, উচ্চ আদালতের রায় সবারই মানা উচিত। এটা সবার জন্য বাধ্যতামূলক। না মানা আদালত অবমাননার শামিল। আইন মেনে না চললে দেশে আইনের শাসন প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

কোনো ব্যক্তির বেপরোয়াভাবে চালানো গাড়ির চাপায় কারও মৃত্যু হলে ওই চালকের শাস্তি হয় দণ্ডবিধির ৩০৪(খ) ধারা অনুযায়ী। ওই ধারায় মৃত্যুর ঘটনায়, তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা জরিমানা অথবা দুই-ই হওয়ার কথা। এক সময় এ সাজার মেয়াদ ছিল সাত বছর। পরে তা সংশোধন করে তিন বছর করা হয়। ২০১৪ সালে হাইকোর্টের এক রায়ে ওই সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে সাজা তিন বছর থেকে বাড়িয়ে সাত বছর করার নির্দেশ দেন। কিন্তু সম্প্রতি প্রণীত নতুন আইনে সংশ্লিষ্ট ধারায় সাজার মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ বছর। এক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের এ সংক্রান্ত নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয়নি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

হাইকোর্টের অপর এক রায়ে সারা দেশে প্রতিটি গাড়িতে গতি নিয়ন্ত্রক যন্ত্র স্থাপনের নির্দেশ দেন আদালত। কিন্তু সেই রায় ঘোষণার ১১ বছরেও নির্দেশনাটি বাস্তবায়ন হয়নি।

২০১৭ সালে সারা দেশে বিভিন্ন যানবাহনে ব্যবহৃত পরিবেশ দূষণকারী হাইড্রোলিক হর্ন বন্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে ঢাকার পাঁচটি এলাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকায় শব্দদূষণের মাত্রা নির্ধারণ ও দূষণ বন্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন আদালত। কিন্তু এ সংক্রান্ত নির্দেশনাটিও পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঝে মাঝে সড়কে অভিযান চালিয়ে যানবাহন থেকে হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করে। কিছুদিন আগে জব্দ করা বেশ কিছু হর্ন ধ্বংস করা হয়।

এদিকে পথচারীদের দুর্ভোগ সৃষ্টি করে রাজধানীর ফুটপাতে প্রায়ই উঠে পড়ে মোটরসাইকেল। অনেক সময় তারা ফুটপাতের পথচারীদের সাইড দেয়ার জন্য বিকট শব্দে হর্ন বাজায়। এমনকি কিছু পুলিশ সদস্যকেও একই কাজ করতে দেখা গেছে। ২০১২ সালে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ ফুটপাতে মোটরসাইকেল চালানো অবৈধ ঘোষণা করেন। সে সময় এ ধরনের চালকদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশকে নির্দেশ দেন সর্বোচ্চ আদালত। এদিকে মোটরযান আইন ১৯৮৮ (সংশোধনী) অনুসারে, মোটরসাইকেল চালক ও যাত্রী দু’জনের মাথায় অবশ্যই হেলমেট থাকার কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।

এছাড়া ২০১২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা জজকোর্টের আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী ও বিচারকদের ট্রাফিক জ্যামের ভোগান্তি দূর করতে জিরো পয়েন্ট থেকে সদরঘাট পর্যন্ত ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ফুটপাত দখলমুক্ত করতে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। আদালতের আদেশে বলা হয়, জিরো পয়েন্ট থেকে সদরঘাট পর্যন্ত ফুটপাত বা রাস্তার ওপর বালু, রড বা যে কোনো পণ্য রাখা, ভ্যান এবং ঠেলাগাড়ি পার্কিং, রাস্তার পাশে দোকানগুলোর পণ্য ফুটপাত বা রাস্তা দখল করে না রাখা, দোকান ও ফেরিওয়ালা, ফলের দোকান যেন না বসতে পারে সেজন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ফুটপাত দখলমুক্ত হয়নি।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান অনুসারে, বাংলাদেশে গত বছর ৫ হাজার ৫১৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ২২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১৫ হাজার ৪৬৬ জন। সমিতির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতা, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেডফোন ব্যবহার, মাদক সেবন করে যানবাহন চালানোর কারণে অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে।

বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান, সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবদুল বাসেত মজুমদার বলেন, উচ্চ আদালতের রায় যারা বাস্তবায়ন করছেন না তাদের আইনের আওতায় আনা দরকার। তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা করা যেতে পারে। তিনি বলেন, আইন মেনে না চললে দেশে আইনের শাসন প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের একজন জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার বলেন, ‘নিজের জন্য হলেও আইন মেনে চলা উচিত সবার। মোটরসাইকেল চালানোর আগে অবশ্যই বিআরটিএ থেকে নিবন্ধন সনদের সঙ্গে পাওয়া আইনগুলো পড়ে নেয়া উচিত। কারণ রাস্তায় চলাচলের ক্ষেত্রে ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করলে জরিমানা গুনতে হবে। ফুটপাত দখলমুক্ত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ফুটপাত দখলমুক্ত আসলে মাছি তাড়ানোর মতোই। সকালে দখলমুক্ত করলে বিকালে আবার দখলে চলে যায়।

 

সূত্র: যুগান্তর

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close
Close