লাইফস্টাইলস্বাস্থ্য

যে কারণে ক্ষুধা কমে যায়

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : ক্ষুধার অনুভূতি কমে যাওয়ার কারণ শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক উভয়ই হতে পারে। স্বাভাবিক নিয়ম হচ্ছে, খাবার খাওয়ার পর একটা নির্দিষ্ট সময়ে ক্ষুধা অনুভূত হবে। কিন্তু বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা অথবা মানসিক বিপর্যয়ে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। এছাড়া লাইফ স্টাইলের কিছু অসঙ্গতি অথবা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেও ক্ষুধামন্দা হতে পারে।

ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া : কেউ ক্ষুধা কমে যাওয়ার অভিযোগ জানালে স্ক্র্যাসডেল মেডিকেল গ্রুপের ডা. ফিনকেলস্টেইন প্রথমে ওই রোগীর ওষুধের তালিকা পরীক্ষা করেন। তিনি বলেন, ‘অনেক ওষুধ ক্ষুধা কমিয়ে ফেলতে পারে। কিছু কমন কালপ্রিট হচ্ছে আফিম থেকে প্রস্তুতকৃত ব্যথানাশক ওষুধ, রক্তচাপের ওষুধ ও পেটে সমস্যা সৃষ্টি করে এমন ওষুধ (যেমন ইবুপ্রোফেন)।’

ঠান্ডা ও ফ্লু : কিছু সাধারণ অসুস্থতা সাময়িকভাবে ক্ষুধা কমাতে পারে, যেমন ঠান্ডা ও ফ্লু, শ্বাসতন্ত্রের ইনফেকশন, ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট ইনফেকশন, ভাইরাসজনিত ইনফেকশন, বমি ও কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো পরিপাকতান্ত্রিক সমস্যা ও ফুড পয়জনিং। ডা. ফিনকেলস্টেইন বলেন, ‘অসুস্থতার কারণে লোকজনের শরীর পানিশূন্য হতে পারে এবং খাবারের প্রতি অনীহা চলে আসতে পারে।’

থাইরয়েডের ভারসাম্যহীনতা : নিম্ন ক্রিয়াশীল থাইরয়েড ও উচ্চ ক্রিয়াশীল থাইরয়েড উভয়েই ক্ষুধার অনুভূতি ভোঁতা করতে পারে। থাইরয়েড গ্রন্থি রক্তপ্রবাহে হরমোন নিঃসরণ করে, যা বিপাককে নিয়ন্ত্রণে রাখে। কিন্তু এ হরমোনের পরিবর্তনে ক্ষুধার অনুভূতিতে পরিবর্তন আসতে পারে।

গর্ভাবস্থা : নারীদের প্রথম ট্রাইমেস্টারে বমিভাব হতে পারে, যা ক্ষুধা হ্রাসের কারণ। ডা. ফিনকেলস্টেইন বলেন, ‘কখনো কখনো জন্মনিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকলেও গর্ভধারণ হয়ে যেতে পারে। তাই নারীর পক্ষে ক্ষুধা কমে যাওয়ার এই কারণটি শনাক্ত করতে বিলম্ব হতে পারে।’

ধূমপান : ধূমপান ও ক্ষুধা হ্রাসের প্রসঙ্গে ডা. ফিনকেলস্টেইন বলেন, ‘ধূমপান হচ্ছে একটি উদ্দীপক ও উক্ত্যক্তকারী। এটি পাচক উদ্দীপনা সৃষ্টি করে আপনাকে অসুস্থ করে তুলতে পারে। এই অসুস্থতা পরিপাকতন্ত্রকে প্রভাবিত করে ক্ষুধা কমাতে পারে।’ যেসব লোক ধূমপান ছেড়ে দেন তারা আবারও ক্ষুধা অনুভব করেন।

অ্যালকোহল: মাদক ও ক্ষুধার যোগসূত্র প্রসঙ্গে ডা. ফিনকেলস্টেইন বলেন, ‘মাদকে পুষ্টিমান নেই এমন ক্যালরি থাকে। এ কারণে যারা যত বেশি ড্রিংক করেন তাদের পেট ফেঁপে যাওয়ার আশঙ্কা তত বেশি। অ্যালকোহল অগ্ন্যাশয় ও যকৃতকে উক্ত্যক্ত করে ও পেটে তরল সঞ্চিত করে। এসবকিছু খাবারের প্রতি অনাগ্রহ সৃষ্টি করতে পারে।’ যারা মাদকে আসক্ত তাদের ওজন অস্বাভাবিক হারে কমে যায় ও ক্ষুধা সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে যেতে পারে।

মানসিক চাপ : মায়ো ক্লিনিকের প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, যেকোনো ধরনের অ্যাডজাস্টমেন্ট ডিসঅর্ডার আপনার ক্ষুধার অনুভূতিতে পরিবর্তন আনতে পারে, যেমন পারিবারিক চাপ বা মানসিক চাপ, চাকরি চলে যাওয়া ও প্রিয়জনের মৃত্যু। কিন্তু কখনো কখনো এর বিপরীতটাও ঘটতে পারে।

স্মৃতিভ্রংশতা: অ্যালঝেইমারস রোগ ও অন্যান্য ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশতায় আক্রান্ত লোকেরা স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া ও বিভ্রান্তির কারণে খাবার খেতে ভুলে যেতে পারেন। তাদের পক্ষে খাবার কেনা ও প্রস্তুতের মতো প্রাত্যহিক কাজ করা কঠিন হতে পারে। স্মৃতিভ্রংশতাজনিত বিঘ্নিত জীবনযাপনের কারণে তাদের ক্ষুধা হ্রাস পাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

পানিশূন্যতা: পানিশূন্যতা ও ক্ষুধার সম্পর্ক নিয়ে ডা. ফিনকেলস্টেইন বলেন, ‘পর্যাপ্ত পানি পান না করলে অথবা তরল জাতীয় খাবার না খেলে অসুস্থতা অনুভব করতে পারেন। পানিশূন্যতায় ভলিউম কনট্র্যাকশন হয় যা ক্ষুধাকে প্রভাবিত করে। এটি বয়স্ক লোকদের মধ্যে বেশি কমন। যখন কেউ বার্ধক্যে পদার্পণ করেন, তার কম তৃষ্ণা অনুভব হতে পারে।’ তৃষ্ণা অনুভবের মানে হলো শরীরে তরল কমে গেছে, এ অবস্থায় পানি পান করতে ভুলবেন না।

পরিপাকতান্ত্রিক অসুস্থতা: ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রোম (আইবিএস), ক্রন’স রোগ, আলসারেটিভ কোলাইটিস ও পরিপাকতন্ত্রের অন্যান্য সমস্যা ক্ষুধার অনুভূতিকে নষ্ট করতে পারে। এসব অসুস্থতা বমিভাব, ব্যথা ও কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়াকে প্ররোচিত করতে পারে, এর ফলে খাবারের প্রতি অনীহা চলে আসতে পারে। ইরিটেবল বাওয়েল ডিজিজে মুখে আলসারও হতে পারে- মুখের আলসারে খাবার এড়িয়ে চলা স্বাভাবিক, কারণ খেতে গেলেই অস্বস্তি বা ব্যথা হয়।

অ্যাসিড রিফ্লাক্স: গ্যাস্ট্রোএসোফ্যাজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (জিইআরডি) বা অ্যাসিড রিফ্লাক্স হচ্ছে আরেকটি পরিপাকতান্ত্রিক অসুস্থতা যা ক্ষুধার অনুভূতি হ্রাস করতে পারে। যাদের জিইআরডি রয়েছে তারা প্রতিনিয়ত বুকজ্বালায় ভোগেন। খাবার খাওয়ার পর পাকস্থলির খাবার খাদ্যনালিতে উঠে আসে। ডা. ফিনকেলস্টেইন বলেন, ‘তারা মুখে টক স্বাদ নিয়ে মধ্যরাতে জেগে উঠতে পারেন ও খাবার খাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কমে যেতে পারে। তাদের গলাও উক্ত্যক্ত হতে পারে।’

সিওপিডি: অ্যাক্রোনিমের পূর্ণরূপ হচ্ছে ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ। এটি কিছু ফুসফুসীয় সমস্যাকে প্রকাশ করে, যেমন- এম্ফিসেমা, ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস ও তীব্র হাঁপানি। সিওপিডি ক্ষুধা কমিয়ে পুষ্টিহীনতার কারণ হতে পারে, জার্নাল অব ট্রান্সলেশনাল ইন্টারনাল মেডিসিনে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী। এ সমস্যায় ফুসফুসের কার্যক্রম ব্যাহত হয়, যেকারণে রোগীরা সক্রিয় থাকতে চান না- এর ফলে ক্ষুধা কমে যায়। সিওপিডি রোগীরা বিষণ্নও হতে পারেন- এটিও ক্ষুধাকে ধ্বংস করে।

বিষণ্নতা: যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথের প্রতিবেদন অনুসারে, বিভিন্ন রকম বিষণ্নতার অন্যতম লক্ষণ হচ্ছে, শক্তি নিঃশেষ হওয়া বা ক্লান্তি ও ক্ষুধা কমে যাওয়া। বিষণ্নতার কিছু ধরন হচ্ছে: পারসিসটেন্ট ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার, পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন, সাইকোটিক ডিপ্রেশন ও সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার। বাইপোলার ডিসঅর্ডারেও একই প্রতিক্রিয়া হতে পারে।

ক্যানসার: ক্ষুধাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করতে পারে এমন কিছু ক্যানসার হচ্ছে ডিম্বাশয় ক্যানসার, পাকস্থলি ক্যানসার, বৃহদান্ত্র ক্যানসার, মলাশয় ক্যানসার, অগ্ন্যাশয় ক্যানসার ও মূত্রাশয় ক্যানসার, বলেন ডা. ফিনকেলস্টেইন। ক্যাচেক্সিয়ার কারণে ক্ষুধা কমে যেতে পারে- ক্যাচেক্সিয়া হচ্ছে ক্যানসার অথবা ক্যানসারের চিকিৎসা জনিত বিপাকীয় পরিবর্তন। ডায়াগনস্টিক টেস্টের মাধ্যমে এসব ক্যানসার শনাক্ত করা যায় এবং তাদেরকে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করতে পারলে চিকিৎসায় বেশি সফলতা পাওয়া যাবে। তাই আপনার ক্ষুধা কমে গেলে চিকিৎসককে জানাতে দ্বিধা করবেন না।

 

এস এম গল্প ইকবাল

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close
Close