আলোচিত

সংবাদ ঠিক করে দেয় গোয়েন্দা সংস্থা: শওকত মাহমুদ

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : শওকত মাহমুদ। সিনিয়র সাংবাদিক ও ইকোনিক টাইমস-এর সম্পাদক। জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি। ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের প্রধানও ছিলেন তিনি।

একই সঙ্গে তিনি বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা। সাথে তিনি বাংলাদেশের সমসাময়িক সাংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যম নিয়ে কথা বলেছেন।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের সাংবাদিকরা এবং সংবাদমাধ্যম এখন কতটা স্বাধীনভাবে সংবাদ পরিবেশন করতে পারছে?

শওকত মাহমুদ: আমরা ১০-১১ বছর ধরে মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছি। কারণ এক এগারোর সময় মিডিয়ার যেভাবে টুঁটি চেপে ধরা হয়েছিল তারপর নির্বাচিত সরকার এসে আরো বেশি করে সংবাদমাধ্যম, সংবাদপত্রে স্বাধীন মত প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। এর মধ্যে অনেক সাংবাদিক কারাগারে গেছেন। একইসঙ্গে আমরা কিছু কালো আইন দেখেছি। ডিজিটাল আইন, তার আগে আইসিটি অ্যাক্টের ৫৭ ধারা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যথেচ্ছভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে। এসব কারণে এখন সাংবাদিকরা সেল্ফ সেন্সরশিপের মধ্যে রয়েছে। অনেক ভৌতিক বাধা আছে। বলবো না যে আগের মত তথ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রেস অ্যাডভাইস আসে। এখন কতগুলো গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে ফোন আসে এটা দেয়া যাবে না, ওটা দেয়া যাবে না। সাংবাদিকেরা চাকরি হারিয়েছে। শাসক দল এমনকি সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সংবাদমাধ্যম, সাংবাদিকদের ব্যাপারে কটু মন্তব্য করা হয়। আমার মনে হয় সাংবাদিকেরা এখন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ অবস্থার মধ্যে আছেন।

এই পরিস্থিতির জন্য আপনি প্রধানত কাদের দায়ী করবেন?
এই পরিস্থিতির জন্য আমি মূলত শাসক দলকে দায়ী করব। একইসঙ্গে আমি আমলাতন্ত্রের কথাও বলব। বিচার বিভাগের ক্ষেত্রেও একধরণের আতঙ্ক আছে। আদালত অবমাননার জন্য দাঁড় করানো হয়েছে। প্রশাসনিক বাধাও আছে। সামাজিকভাবে সাংবাদিকরা আতঙ্কে আছেন। খবর সংগ্রহ করতে গেলেও তাদের ওপর হামলা হয়। আসলে সরকার যদি বাধা না দেয় তাহলে সাংবাদিকদের আর কোনো পক্ষই বাধা দেয়ার চিন্তা করতে পারেনা।

অধিকার আদায়ে, মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য অতীতের মত সাংবাদিকরা এখন কেন আন্দোলন গড়ে তুলতে পারছেনা?
এখন যারা বিরোধী দল সমর্থিত সাংবাদিক তারা আন্দোলন করছেন। আর যারা সরকার সমর্থক সাংবাদিক রয়েছেন তারা এই ধরনের আন্দোলনকে উৎসাহিত করেন না অংশও নেন না। আমরা সাগর-রুনি হত্যার বিচারের দাবীতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলেছিলাম। পরে তারা আলাদা হয়ে গেল। সরকার কতগুলো ক্ষেত্রে ঘুসের মত দেয়। যেমন যেদিন পার্লামেন্টে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট পাশ হয়, সেদিন সরকার সমর্থক দু’শতাধিক সাংবাদিককে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে ২০ কোটি টাকা অনুদানের ঘোষণা দেয়া হয়। আর ট্রেড ইউনিয়ন আইনের পরিবর্তনের কারণে এখন সাংবাদিকদের চেয়ে মালিকেরা শক্তিশালী। যেসব সাংবাদিক সরকার বা বিরোধী কোনো পক্ষেই নেই তারাও পরিস্থিতির কারণে চুপ আছেন। মাঠে নামছেন না।

তাহলে সাংবাদিকতার ভবিষ্যতকে আপনি কিভাবে দেখেন বাংলাদেশে?
বাংলাদেশে সাংবাদিকেরা এখন প্রান্তিক মানুষে পরিণত হয়েছেন৷ শুধুমাত্র মত প্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে নয়, এখন শত শত সাংবাদিক ছাটাই হচেছ, চাকরি হারাচ্ছে। এর কোনো প্রতিকার নেই৷ কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগের কথা বলে সংবাদমাধ্যম শুরু করেন, কিন্তু বাস্তবে তারা কিছুদিন পরেই আর্থিক দুরবস্থা, বিজ্ঞাপন না থাকার অজুহাত দেখিয়ে সাংবাকিদের ছাটাই করেন। এসব দেখার কেউ নেই।

সাংবাদিকেরা এখন নীতি নির্ধারণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভূমিকা কেন রাখতে পারছেন না?

যার নীতি নির্ধারক তাদের মধ্যে যদি লজ্জা বোধ না থাকে তাহলেতো তারা সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনকে গুরুত্ব দেবেন না। তারা যদি মনে করেন কোনো অনিয়ম. দুর্নীতি প্রকাশ হলে কিছু এসে যায় না তাহলে তারা সংবাদমাধ্যমকে কেন গুরুত্ব দেবেন? এই সরকার সামাজিক মাধ্যমে তোলপাড় হওয়া কিছু বিষয় যা পরে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে সে ব্যাপারে গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ খবরকে আমলে নেয় না। বলে, সম্পাদক তার স্বার্থে এটা করেছেন।

আপনি বলছিলেন সরকার সমর্থক সাংবাদিক, বিরোধী দল সমর্থক সাংবাদিক৷ সাংবাদিকদের এই দলীয় বিভাজন ঠিক কি না?

পৃথিবীর উন্নত দেশেও রাজনৈতিক কারণে সাংবাদিকদের বিভাজন নয়, পৃথক চিন্তা, স্বাতন্ত্র্য থাকে। সেখানেও নানা দলের সমর্থক সাংবাদিকরা আছেন। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে সত্য প্রকাশ যাতে কোনোভাবে প্রভাবিত না হয় সেটা সবার চেষ্টা কর উচিত। বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমে বিরোধী দলের যত সমালোচনা করা হয়, সরকারের সমালোচনা তেমন হয় না। এখন সরকার সমর্থক সাংবাদিকেরা এখন বেশি চাকরিতে আছে। আর দক্ষতা আর যোগ্যতা থাকার পরও বিরোধী দল সমর্থক সাংবাদিকদের চাকরি দেয়া হয় না।

সাংবাদিকদের এই সরকার সমর্থক বা বিরোধীদল সমর্থক হওয়ার পিছনে কি শুধু আদর্শিক কারণ না অন্য কোনো কারণ বা স্বার্থ আছে?

প্রথমত: সরকার সমর্থক হলে সাংবাদিকতার চাকরির ক্ষেত্রে সুবিধা হয়। দ্বিতীয়, সরকার সমর্থক হলে অনেক সামাজিক সুবিধা পাওয়া যায়। যেমন সাংবাদিকেরা জায়গা পেয়েছেন, জমি পেয়েছেন অনেক। বিদেশ ভ্রমণ সরকাারি টেলিভিশনের সদস্য হলে অনেক সহজ হয়ে যায়৷ আরো অনেক সুবিধা আছে।

তারপরও ভবিষ্যতে কেমন সাংবাদিকতার স্বপ্ন দেখেন বাংলাদেশে?
দেশে একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে এলে সাংবাদিকতা ফোর্থ স্টেট বা ওয়াচ ডগের কাজটি করতে পারবে। তবে এরজন্য চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে কেন সাংবাদিকতা করব। সেটা দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য, নিজের জন্য না দলের জন্য?

 

সূত্র: ডয়চে ভেলে

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close
Close