মুক্তমত

ক্রসফায়ারে উল্লাস, গণপিটুনিতে আতঙ্ক কেন?

হারুন উর রশীদ : আমাদের চরিত্রের এই এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। আমাদের কেউ কেউ ক্রসফায়ারে উল্লাস প্রকাশ করি। কিন্তু গণপিটুনিতে আতঙ্কিত হই। বিক্ষুব্ধ প্রতিবাদ জানাই। কিন্তু দুটোই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। দুটিই হয় সন্দেহের ভিত্তিতে। অপরাধ প্রমাণের আগে।

কোনও ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডই গ্রহণযোগ্য নয়। যেখানে বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হয়, যেখানে পুলিশ তার সঠিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, সেখানেই এই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মানুষ যখন মনে করে বিচার পাওয়া যাবে না, বা বিচার হবে না, সেখানেই সুযোগ পেলে সে নিজেই বিচারক হতে চায়। বিচার করতে চায়। সে ভুলে যায় আইনের বাইরে বিচার করার কোনও অধিকার কারও নেই।

নাগরিকদের এই মানসিক অবস্থার সুযোগও নেয় কেউ কেউ। ‘সাঈদীকে চাঁদে দেখা গেছে’ গুজব ছড়িয়ে নাশকতা করা তাই এই দেশেই সম্ভব। আর পদ্মা সেতুতে ‘মানুষের রক্ত ও মাথা লাগাবে’ গুজব ছাড়ানোর পেছনেও আছে অসৎ উদ্দেশ্য।
কিন্তু প্রশ্ন হলো মানুষ কেন গুজব বিশ্বাস করে? এর একটা কারণ হলো তার প্রবৃত্তি। আরেকটা হলো আইন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা। সভ্য সমাজে সুশাসন দিয়ে মানুষকে তার সুপ্রবৃত্তি জাগিয়ে তোলা হয়। আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র সেখানে অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে।

মনে রাখা উচিত মব (উচ্ছৃঙ্খল জনতা) একটি ভয়াবহ প্রবণতা। একজন নিরীহ মানুষের মধ্যেও এটা সঞ্চারিত হতে পারে। এবং তাই হচ্ছে। ছেলেধরা সন্দেহে একদল মানুষ যখন একজন মাকে হত্যা করে, ওই দলবদ্ধ মানুষ মব হয়ে যায়। তাদের মধ্যে একযোগে বিবেকবোধ লোপ পায়। কিন্তু সাধারণ অবস্থায় তারাই আবার নিরীহ মানুষ। তাদেরও বিবেকবোধ আছে। আসলে পরিস্থিতি তাকে মবে পরিণত করে। সে ঘটনার সময় মনে করে, সত্যিই সে একটা ‘ভালো কাজ’ করছে। সে ‘ন্যায় বিচারে’ অংশ নিচ্ছে। সে বিচার না করলে এর বিচার হবে না।

একবারও ভাবে না যাকে হত্যা করছে, সে আদৌ অপরাধী কিনা। একবারও ভাবে না যাকে নির্মমভাবে পেটাচ্ছে, তাকে পেটানো উচিত কিনা। মানবিকতা তো দূরের কথা, সে যে বেআইনি কাজ করছে, তাও সে মনে করে না। কারণ তাকে দেশের আইন, বিচার, অপরাধ দমন প্রক্রিয়া সেটা শেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। ওই ব্যবস্থার প্রতি তার অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে।

আমরা এই সাম্প্রতিক অমানবিক এবং বেআইনি গণপিটুনি পরিস্থিতিতে এখন চরম উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছি। আমরা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের বিচার দাবি করছি। আমরা এই পরিস্থিতির অবসান চাইছি। কিন্তু এই শুভ চিন্তার মানুষদের বড় অংশই আবার ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করছি। উল্লাস প্রকাশ করছি। বরগুনার নয়ন বন্ড ক্রসফয়ারে নিহত হওয়ার পর আমরা অভিনন্দন জানিয়েছি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। আমরা বিচারের মাধ্যমে তার অপরাধ প্রমাণ করে শাস্তি দাবি করিনি। শুধু তাই নয়, আরো ক্রসফায়ার দেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছি। এটাই আমাদের চরিত্রের এক অন্ধকার দিক। এটাই আমাদের চরিত্রের বৈপরীত্য।

আর এটা প্রমাণ করে, আসলে আমরা নিজেরাই বিচারক হতে চাই। আমরা আমাদের মতো করে সবকিছুর সমাধান পেতে চাই। আইনি প্রক্রিয়ায় আমরা বিচার চাই না। অথবা ওই বিচারে আমরা আস্থা রাখতে পারছি না। যদি আস্থা রাখতে পারতাম, তাহলে ক্রসফায়ারে উল্লসিত হই কীভাবে! বিচারের বাইরে কোনও হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করি কীভাবে?

ত্রসফায়ারে হত্যা আর গণপিটুনিতে হত্যার মধ্যে কি কোনও পার্থক্য আছে? দুটিই তো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। দুটিই তো বেআইনি। দুটিই তো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। একটি ঘটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে। আরেকটি ঘটায় উত্তেজিত জনতা। আর দুটির ক্ষেত্রেই সুযোগসন্ধানীরাও থাকে। তারা তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য এই দুটি প্রক্রিয়াকে কাজে লাগায়। যেখানে ন্যায়বিচার অনিশ্চিত। অপরাধীর শাস্তির আশা মানুষ ছেড়ে দেয়। সেখানে গণপিটুনি মাথাচাড়া দেয়। আর এই বিচারহীনতাকে ধামাচাপা দিতে ক্রসফায়ারের বিভ্রান্তিতে ফেলা হয় সাধারণ মানুষকে। বিচারহীনতায় বিচার দেখানোর এ এক ক্রসফায়ার কৌশল।

আপনাদের সুচিন্তার কাছে তাই আমার প্রশ্ন। যে আমরা আজ এই গণপিটুনিতে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন, সেই আমরা কেন ক্রসফায়ারে উদ্বিগ্ন হই না। প্রতিবাদ জানাই না। তাহলে আমরা কি আমাদের চরিত্রের দ্বিচারিতার দোষে দুষ্ট?

এই চারিত্রিক বৈপরীত্য নিয়ে আমরা দেশে কীভাবে সুশাসন আশা করি? কীভাবে আমরা ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করতে পারি? দূরে দাঁড়িয়ে সুবচন সহজ। বাস্তবে মাঠে আমরা কী আচরণ করতাম, তার তো নিশ্চয়তা আমরা কেউই দিতে পারছি না।

লেখক: সাংবাদিক
ইমেইল:swapansg@yahoo.com

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close
Close