আইন-আদালতআলোচিত

সাইবার অপরাধের মামলা প্রায় ৪ হাজার, শাস্তি মাত্র ২৫ জনের

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : সাইবার অপরাধের মামলা প্রায় ৪ হাজার, শাস্তি মাত্র ২৫ জনের গত ছয় বছরে সাইবার অপরাধের ঘটনায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন থানায় মামলা হয়েছে তিন হাজার ৬৫৯টি। এর মধ্যে সাইবার ট্রাইব্যুনালে গেছে এক হাজার ৫৭৫টি মামলা। নিষ্পত্তি হয়েছে ৫২২টির। মাত্র ২৫টি মামলায় আসামিদের সাজা হয়েছে। পুলিশের ক্রাইম ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (সিডিএমএস) পরিসংখ্যান ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সাধারণত ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, গুগল, স্কাইপ -এ ভুয়া আইডি খুলে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টাল ও ব্লগে মিথ্যা ও মানহানিকর তথ্য প্রচার, অশ্লীল ছবি ও ভিডিও আপলোড এবং মেসেজ পাঠিয়ে প্রতারণার ঘটনাগুলোই মোটা দাগে সাইবার অপরাধ হিসেবে পরিচিত।

জানা যায়, দেশে ১৩ ধরনের সাইবার অপরাধের ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে আছে— পারিবারিক বিদ্বেষ সৃষ্টি, স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া, বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে বিরোধ তৈরি, উগ্র ও বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য প্রচার, ইউটিউবে অন্তরঙ্গ ভিডিও ও ছবি আপলোড, ফেক অ্যাকাউন্ট তৈরি, পাসওয়ার্ড বা গোপন নম্বর অনুমান করে আইডি হ্যাক, মোবাইল ব্যাংকিং, ই-কমার্স, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি, অনলাইন এমএলএম (মাল্টি লেভেল মার্কেটিং), অনলাইনে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনলাইন গ্যাম্বলিং (জুয়া)।

এসব অপরাধ নিয়ে কাজ করছে পুলিশ সদর দফতরের লফুল ইন্টারসেপশন সেল (এলআইসি), কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল (সিসিটিসি) ইউনিটের সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগ, অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার পুলিশ সেন্টার, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) সাইবার অপরাধ তদন্তবিষয়ক সেল, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের সাইবার হেল্প ডেস্ক ও ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি)।

পুলিশের ক্রাইম ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (সিডিএমএস) পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৩ সালে ৩৫টি ও ২০১৪ সালে ৬৫টি মামলা হয় সারাদেশে। ২০১৪ থেকে ২০১৫ সালে মামলা হয় ৫৯৭টি যার মধ্যে ১৩৭টি ঢাকায়। ২০১৬ সালে সারাদেশে মামলা হয় ৮৭৯টি যার মধ্যে ঢাকায় ২০৬টি। ২০১৭ সালে মামলা হয় এক হাজার ২৮টি। এর মধ্যে ঢাকায় ২৩৬টি। ২০১৮ সালে মামলা হয় এক হাজার ৫৫টি যার মধ্যে ৩৩৩টি ঢাকায়। তথ্য বলছে, ২০১৫-২০১৮ সালে শুধু ঢাকায় মামলা হয়েছে ৯১২টি।

সাইবার অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অপরাধের শিকার হওয়া শতকরা ৩৪ ভাগের বয়স ১৯ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। ৩১ ভাগের বয়স ২৬ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। ২৭ ভাগের বয়স ৩৬ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে। ছয় ভাগের বয়স শূন্য থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। আর দুই ভাগের বয়স ৫৫ বছরের বেশি। পরিসংখ্যান বলছে, ক্ষতিগ্রস্তদের ৫৩ ভাগ নারী, পুরুষ ৪৭ ভাগ। ২৩ থেকে ২৫ বছর বয়সী নারীরাই সবচেয়ে বেশি সাইবার অপরাধের শিকার হন।

সাইবার অপরাধের বিচার হয় সাইবার ট্রাইব্যুনালে। এই ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৩ সালের ২৮ জুলাই। ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম শামীম জানান, প্রতিষ্ঠার পর সারাদেশে তিন হাজার ৬৫৯টি মামলার মধ্যে বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনালে গেছে ১৫৭৫টি। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৫২২টির। ২৫টি মামলায় অপরাধ প্রমাণ হওয়ায় আসামিদের সাজা হয়েছে।

সাইবার অপরাধ দিন দিন বাড়লেও এ প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কতটা প্রস্তুত তা নিয়ে প্রশ্ন আছে সংশ্লিষ্টদের। সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে আছে কঠোর আইন। কিন্তু তদন্তে ত্রুটি, মামলার একপর্যায়ে বাদীর অনীহা, আদালতে সাক্ষীর হাজির না হওয়া, বাদী-বিবাদীর মধ্যে আপস ইত্যাদি কারণে মামলা খারিজ হয়ে যাচ্ছে। মামলার বিচারে সাজার হার তার প্রমাণ দিচ্ছে।

পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) সোহেল রানা বলেন, ‘অপরাধের ধরন ও ধাঁচের যে ভিন্নতা তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। সাইবার অপরাধ মোকাবিলার জন্য পুলিশের প্রতিটি ইউনিটে একটি করে সাইবার মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। এই ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশের সক্ষমতা দিন দিন বাড়ছে। সংযোজন করা হচ্ছে সর্বশেষ প্রযুক্তি। কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বাড়াতে বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও হচ্ছে।

সাইবার ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম শামীম বলেন, ‘ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, গুগল, স্কাইপ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরকারের কোনও চুক্তি নেই। ফলে মামলার আলামতের জন্য তাদের কাছে সহযোগিতা চেয়ে পাওয়া যায় না।’ তিনি বলেন, ‘মামলা করার সময় বাদী সাইবার অপরাধ সংশ্লিষ্ট আলামতের স্ক্রিনশট, লিংক, অডিও বা ভিডিও ফাইল অথবা সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র জমা দেন। কিন্তু মামলা হওয়ার পর দেখা যায়, আসামি সংশ্লিষ্ট আলামত যেমন স্ক্রিনশট, লিংক, অডিও বা ভিডিও ফাইল মুছে ফেলে দাবি করেন তিনি কোনও অন্যায় করেননি। এ ক্ষেত্রে ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, গুগল, স্কাইপ -এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তারা আসামির মুছে ফেলা নথি সরবরাহ করলে তা দালিলিক প্রমাণ হিসেবে আদালতের কাছে গুরুত্ব পাবে এবং আসামির সাজা নিশ্চিত হবে।

আইনজীবী অ্যাডভোকেট তুহিন হাওলাদার বলেন, ‘সাইবার অপরাধ প্রমাণে আলামতের পাশাপাশি সাক্ষীও গুরুত্বপূর্ণ। এই অপরাধের মামলা দেশের বিভিন্ন থানায় হয়। মামলার অভিযোগপত্র দাখিলের পর ঢাকায় বিচার শুরু হলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সাক্ষী উপস্থিত থাকেন না। সাইবার আইন নিয়ে কোনও ধারণা না থাকার পাশাপাশি ঢাকায় যাতায়াতের খরচের বিষয়টিও সাক্ষীর কাছে গুরুত্ব পায়। সাক্ষীর অনুপস্থিতিতে সুবিধা হয় আসামির।’

 

সূত্র:বাংলা ট্রিবিউন

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close
Close