গাজীপুর

তিন বন্ধুকে অপহরণ করে ‘ক্রসফায়ারের’ হুমকি দিয়ে মুক্তিপণ দাবি পুলিশের

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : তিন তরুণ বন্ধুকে অপহরণ করে ‘ক্রসফায়ারের’ হুমকি দিয়ে ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে গাজীপুর এবং টাঙ্গাইল জেলার দুই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার কালিয়াকৈর থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আবদুল্লাহ আল মামুন ও মির্জাপুর থানার এএসআই মুসফিকুর রহমানকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

অপহরণ ও মুক্তিপণের কথা স্বীকার করেছেন অভিযুক্ত দুই পুলিশ সদস্য। তবে একে অপরের ওপর দোষ চাপিয়েছেন।

অপহৃত তিন বন্ধু হলেন কালিয়াকৈর উপজেলার বড়ইবাড়ি এলাকার রায়হান সরকার, লাবিব হোসেন ও শ্রীপুর উপজেলার চন্নাপাড়া এলাকার নওশাদ ইসলাম।

রায়হান জানান, গত বুধবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে ব্যক্তিগত গাড়িতে করে রাজধানীর বাণিজ্য মেলার উদ্দেশে রওনা হন তাঁরা পাঁচ বন্ধু। বিকেল পাঁচটার দিকে তাঁরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কালিয়াকৈর উপজেলার সূত্রাপুর এলাকায় শিলা-বৃষ্টি ফিলিং স্টেশনে যান গ্যাস নিতে। গ্যাস নেওয়ার সময় তরিবুল্লাহ ও রাকিবুল রহমান নামে দুই বন্ধু গাড়ি থেকে নেমে পাশের দোকানে চা খেতে যান। বাকিরা গাড়িতেই অবস্থান করছিলেন। এ সময় দুটি গাড়ি নিয়ে সেখানে হাজির হন এএসআই আবদুল্লাহ আল মামুন ও মুসফিকুর রহমান। তাঁরা সাদাপোশাকে ছিলেন। মুসফিকুরের মাইক্রোবাসে সাদাপোশাকের আরও কয়েকজন লোক ছিলেন। চার-পাঁচজন রায়হানসহ তিন বন্ধুকে তাঁদের গাড়ি থেকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে মাইক্রোবাসে তোলেন।

রায়হান বলেন, তাঁদের টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের দেওড়া এলাকায় নির্মাণাধীন উড়ালসড়কের নিচে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিন বন্ধুকে মুক্তি দেওয়ার বিনিময়ে ৩০ লাখ টাকা দাবি করেন ওই দুই পুলিশ কর্মকর্তা। দাবি করা টাকা না দিলে ‘ক্রসফায়ারে’ মেরে ফেলারও হুমকি দেওয়া হয়। পরে বেশ কিছু সময় তাঁদের সঙ্গে টাকা নিয়ে দেনদরবার হয়। একপর্যায়ে দুই এএসআই ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হবে বলে জানান।

এদিকে অপহরণের কবল থেকে রক্ষা পাওয়া দুই বন্ধু তরিবুল্লাহ ও রাকিবুল মুঠোফোনে পুরো ঘটনা কালিয়াকৈর থানা-পুলিশ এবং অপহৃত তিন বন্ধুর পরিবারের সদস্যদের জানান। তরিবুল্লাহ বলেন, তাঁদের অভিযোগ জানার পর কালিয়াকৈর থানা থেকে একটি দলকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। তারা প্রাথমিকভাবে খোঁজখবর নিয়ে নিশ্চিত হয়, এএসআই মামুন ও মুসফিকুর এই অপহরণের সঙ্গে জড়িত।

পরে কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলমগীর হোসেন মজুমদার এএসআই মামুনকে ফোন করলে তিনি তিন তরুণকে তুলে নেওয়ার কথা স্বীকার করেন। দুই থানার সহযোগিতায় অপহৃত তিন তরুণকে বুধবার রাত আটটার দিকে প্রথমে মির্জাপুর থানায় এবং পরে রাত ১২টার দিকে কালিয়াকৈর থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনাটি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে জানাজানি হলে বৃহস্পতিবার দুপুরে কালিয়াকৈর থানার এএসআই আবদুল্লাহ আল মামুন ও মির্জাপুর থানার মুসফিকুর রহমানকে প্রত্যাহার করে নিজ নিজ পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়। মুসফিকুর আগে কালিয়াকৈর থানায় কর্মরত ছিলেন।

মুক্তি পাওয়া তিন তরুণ জানান, থানা-পুলিশ থেকে বলা হয়েছে, এই ঘটনায় তাঁরা যেন শুক্রবার গাজীপুরের পুলিশ সুপার শামসুন্নাহারের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন।

তুলে নেওয়ার কথা স্বীকার করে এএসআই আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘আমি মুক্তিপণ চাইনি। মুক্তিপণ চেয়েছে মির্জাপুর থানার পুলিশ। আমি তাদের সহযোগিতা করেছি। তাদের সহযোগিতা করাটাই আমার ভুল হয়েছে।’ তবে মির্জাপুর থানার এএসআই মুসফিকুর রহমান দোষ চাপাচ্ছেন মামুনের ওপর। তিরি বলেন, ‘কালিয়াকৈর থানার এএসআই মামুনের পরামর্শেই তাঁদের (তিন তরুণ) ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। মামুনই তাঁদের কাছে ৩০ লাখ টাকা চেয়েছে।’

গাজীপুরের পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মামুন ও মুসফিকুর রহমান একসময় গাজীপুর গোয়েন্দা পুলিশে (ডিবি) একসঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। ওই সময় থেকে তাঁদের মধ্যে সখ্য। ডিবিতে দায়িত্ব পালনের সময় তাঁরা নিরীহ মানুষদের ধরে নিয়ে টাকা আদায় করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁরা গাজীপুর গোয়েন্দা পুলিশে থাকার সময় আসামি ধরতে গিয়ে আসামির বাড়ি থেকে টাকা, স্বর্ণালংকার লুটপাট করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

গাজীপুরের পুলিশ সুপার শামসুন্নাহার বলেন, বুধবারের ঘটনাটি জানার পর এএসআই মামুনকে প্রত্যাহার করে গাজীপুর পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়। এ ছাড়া তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার সঞ্জিত কুমার রায় বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং এএসআই মুসফিকুরকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

 

সূত্র: প্রথম আলো

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close
Close